নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জীবনাদর্শ, মানবপ্রেম, ন্যায়, সাম্য, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা অনুসরণের মধ্য দিয়েই সমাজ ও পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন কুতুববাগ দরবার শরিফের পীর ও মুর্শেদ হযরত সৈয়দ জাকির শাহ নকশবন্দী কুতুববাগী।
তিনি বলেন, মহানবী (সা.) শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর জীবনে মানবিকতা, ক্ষমা, ভালোবাসা, ন্যায়বিচার, অসহায়ের প্রতি সহমর্মিতা এবং মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার অনন্য শিক্ষা রয়েছে। তাই মহানবী (সা.)-এর আদর্শকে ব্যক্তিজীবন, পরিবার ও সমাজে বাস্তবায়ন করতে পারলে হিংসা, বিদ্বেষ, বৈষম্য ও বিভেদ অনেকটাই দূর করা সম্ভব।
বুধবার (২৬ আগস্ট) পবিত্র ১২ রবিউল আউয়াল উপলক্ষে রাজধানীর ফার্মগেটের কুতুববাগ দরবার শরিফে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপনের শেষ দিনে বাদ জোহর খাস বয়ানে তিনি এসব কথা বলেন।
পীর কুতুববাগী বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমন মানবজাতির জন্য আল্লাহর বিশেষ রহমত। তাঁর চরিত্র, কর্ম, কথা ও জীবনাচরণ মুসলমানদের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ। তাঁর শিক্ষা মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি নয়, বরং ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক সম্মান প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেয়।
তিনি বলেন, বর্তমান পৃথিবীতে অশান্তি, হিংসা, বিদ্বেষ, অন্যায় ও বৈষম্য বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো মানুষ নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। মহানবী (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সত্য, ন্যায়, আমানতদারি, দয়া ও পরস্পরের প্রতি দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এ দিন মহানবী (সা.)-এর জীবন ও শিক্ষা স্মরণ করে নিজেদের জীবনকে তাঁর আদর্শে গড়ে তোলার অঙ্গীকারের দিন।
১২ রবিউল আউয়াল মুসলিম বিশ্বের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। এ উপলক্ষে কুতুববাগ দরবার শরিফে মহানবী (সা.)-এর জন্ম ও তাঁর পবিত্র জীবনাদর্শ স্মরণ করে বিভিন্ন ধর্মীয় কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
বয়ানে মহানবী (সা.)-এর শৈশব, তাঁর সত্যবাদিতা ও আমানতদারি, মক্কা-মদিনার জীবনের বিভিন্ন ঘটনা, মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা, অসহায় ও দরিদ্রদের প্রতি তাঁর দায়িত্ববোধ এবং সমাজে ন্যায় ও সাম্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।
এ সময় বক্তারা বলেন, মহানবী (সা.)-এর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—মানুষকে ভালোবাসা, অন্যের অধিকার রক্ষা করা, অন্যায় থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের মাধ্যমে জীবন পরিচালনা করা। তাঁর আদর্শকে শুধু আলোচনা ও মাহফিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনে প্রয়োগের ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে কুতুববাগ দরবার শরিফে দুই দিনব্যাপী নানা ধর্মীয় কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বাদ মাগরিব থেকে শুরু হয় মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ, তাঁর সুন্নাহ এবং উম্মতে মোহাম্মদীর করণীয় বিষয়ে ধারাবাহিক আলোচনা।
দরবার শরিফের প্রখ্যাত ওলামায়ে কেরাম কোরআন ও হাদিসের আলোকে মহানবী (সা.)-এর পবিত্র জীবন, চরিত্র ও আদর্শের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। একই সঙ্গে দরূদ ও সালাম, কিয়াম, জিকির, মোরাকাবা-মোশাহেদাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
দুই দিনব্যাপী এ আয়োজনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর আদর্শ অনুসরণের বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরা। দরবারে আগত ভক্ত-আশেকান ও ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের মধ্যে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য ও ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বুধবার বাদ জোহর ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন পীরে কামেল, মুর্শিদে মোকাম্মেল হযরত সৈয়দ জাকির শাহ নকশবন্দী কুতুববাগী।
মোনাজাতে বাংলাদেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা, কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনা করা হয়। পাশাপাশি মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, শান্তি ও সমৃদ্ধি এবং বিশ্বের সকল মানুষের কল্যাণ কামনা করা হয়। দেশ ও জাতির সংকট, অশান্তি ও বিভেদ দূর করে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশেষ দোয়া করা হয়।
আখেরি মোনাজাতে বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নাজিমুদ্দিন আলম, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও এলাকা থেকে কুতুববাগ দরবার শরিফের হাজার হাজার ভক্ত-আশেকান, জাকেরান ও ধর্মপ্রাণ মুসল্লি এতে অংশ নেন।
কুতুববাগ দরবার শরিফের আয়োজনে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর এ অনুষ্ঠান শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং তা সমাজজীবনে বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার প্রকৃত প্রকাশ তাঁর সুন্নাহ ও আদর্শ অনুসরণ করা। মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো, অন্যের অধিকার রক্ষা করা, সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকা এবং সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখাই তাঁর জীবন থেকে পাওয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে আখেরি মোনাজাতের পর উপস্থিত ভক্ত-আশেকান ও মুসল্লিদের মধ্যে তবারক বিতরণ করা হয়। দুই দিনব্যাপী এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে কুতুববাগ দরবার শরিফে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চার এক আবহ তৈরি হয়।