বিশেষ প্রতিবেদন :
ক্যাডেট কলেজের মেধাবী শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা নেওয়া বিনয়ী ও মেধাবী কর্মকর্তা আফসারের অকালমৃত্যু নাড়া দিয়েছে তার সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের। তার মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক সহকর্মীর আবেগঘন পোস্টে সরকারি চাকরিতে পদোন্নতি ও পদায়নে বৈষম্যের অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে।

“একজন সহকর্মীর আবেগঘন ফেসবুক পোস্ট,
ওই পোস্টে আফসারের সহকর্মী প্রশ্ন তুলেছেন, “মেধাবী, বিনয়ী ও ব্রিলিয়ান্ট অফিসারের প্রমোশন না হওয়ার পেছনে যারা দায়ী, তারা কি আফসারের অকালমৃত্যুর জন্য দায়ী নয়?”
তবে আফসারের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং তার সঙ্গে পদোন্নতিবঞ্চনার কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল কি না, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সামনে আসেনি। ফলে বিষয়টি বর্তমানে অভিযোগ ও প্রশ্নের পর্যায়েই রয়েছে।
আফসারের কর্মজীবনের শুরু থেকেই তাকে চিনতেন এমন এক কর্মকর্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ঢাকা কমিশনার অফিসে ২৫ ব্যাচের একদল মেধাবী কর্মকর্তা চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় তিনি সহকারী কমিশনার (সাধারণ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। সদ্য যোগ দেওয়া কর্মকর্তাদের ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি।
তার বর্ণনায় আফসার ছিলেন “অসম্ভব মেধাবী, বিনয়ী ও শান্ত স্বভাবের”। সবসময় মুখে হাসি থাকত, দেখা হলেই হাসিমুখে কুশল বিনিময় করতেন। সেই সহকর্মীর আক্ষেপ—“আর কোনোদিন সেই হাসি দেখব না।”আফসার ২৫তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা হয়েও মৃত্যুর সময় স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব পদে ছিলেন;
আফসারের মৃত্যুকে ঘিরে ওঠা প্রশ্নের পাশাপাশি সামনে এসেছে আরও বড় একটি বাস্তবতা। সরকারের বিভিন্ন দপ্তর, ক্যাডার ও বাহিনীতে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি ও পদায়নবঞ্চিত কর্মকর্তাদের সংখ্যা কম নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
কারও দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় বা ভিন্নমতের কারণে একসময় তারা কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি পাননি। কারও অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছেন। আবার কারও ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও পরবর্তী ব্যাচের কর্মকর্তারা পদোন্নতি পেয়ে তাদের ঊর্ধ্বতন হয়ে গেছেন।
ফলে একই প্রতিষ্ঠানে একজন সিনিয়র কর্মকর্তাকে তারই জুনিয়রের অধীনে কাজ করতে হচ্ছে—যা প্রশাসনিক কাঠামোর পাশাপাশি ব্যক্তিগত মর্যাদা ও মানসিক অবস্থার ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই—যে কারণে একজন কর্মকর্তা অতীতে বঞ্চিত হয়ে থাকলে সরকার পরিবর্তনের পর তার বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা হচ্ছে কি না।
সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নীতিগত পরিবর্তন এলেও দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রভাব একদিনে শেষ হয় না। একটি পদোন্নতি কয়েক বছর পিছিয়ে গেলে পরবর্তী পদোন্নতির সময়, জ্যেষ্ঠতা, পদায়ন এবং অবসরকালীন সুবিধার ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে।
অর্থাৎ একজন কর্মকর্তার ক্যারিয়ারে কয়েক বছর আগের একটি সিদ্ধান্তের প্রভাব দশ-পনেরো বছর পরও থেকে যেতে পারে।
তাই দীর্ঘদিন আগে বঞ্চিত কোনো কর্মকর্তাকে শুধু বর্তমান তালিকা দেখে মূল্যায়ন করলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া নাও যেতে পারে। প্রয়োজন তার পুরো চাকরিজীবনের ধারাবাহিকতা পর্যালোচনা করা।
বঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অংশের বক্তব্যও পরিষ্কার—তারা কারও পদোন্নতি বাতিল বা কারও ক্ষতি চান না। তারা চান, নিজেদের বঞ্চনার কারণ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক এবং যোগ্য হলে প্রাপ্য অধিকার দেওয়া হোক।
একই সঙ্গে নতুন করে কোনো কর্মকর্তা যেন রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, নিজ জেলা বা অন্য কোনো অনানুষ্ঠানিক কারণে বঞ্চিত না হন—এটিও নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ অতীতের বৈষম্য দূর করতে গিয়ে যদি বর্তমানের আরেক কর্মকর্তা বঞ্চিত হন, তাহলে সমস্যার সমাধান হবে না; বরং বঞ্চনার চক্রই চলতে থাকবে।
বর্তমান সরকারের সামনে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব রয়েছে—বিভিন্ন দপ্তর ও বাহিনীতে দীর্ঘদিন পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের বিষয়টি দলীয় বা রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে রেখে যাচাই করা।
প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে—
এভাবে দপ্তরভিত্তিক ও ব্যক্তিভিত্তিক পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত বঞ্চিত এবং নিয়মিত মূল্যায়নে পদোন্নতি না পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে পার্থক্য করা সম্ভব হবে।
দীর্ঘদিন পদোন্নতি না পাওয়া একজন কর্মকর্তার কষ্ট শুধু একটি পদ না পাওয়ার কষ্ট নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আত্মমর্যাদা, ক্যারিয়ার, পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং দীর্ঘ চাকরিজীবনের স্বীকৃতি।
কেউ কেউ যদি মনে করেন, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাদের কোনো মূল্যায়ন হচ্ছে না, তাহলে সেই হতাশা একসময় কর্মস্পৃহাকেও প্রভাবিত করতে পারে। কেউ কেউ চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভাবছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত হতাশা যেন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে অবহেলার কারণ না হয়—এটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
আফসার আজ নেই। তার পরিবার, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য তার অকালমৃত্যু এক অপূরণীয় ক্ষতি। তার মৃত্যুকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব আবেগের নয়—তথ্য ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের।
কিন্তু সেই প্রশ্নকে পাশ কাটিয়েও যাওয়া যায় না।
বিভিন্ন দপ্তর ও বাহিনীতে আর কতজন আফসার রয়েছেন, যারা বছরের পর বছর তাদের প্রাপ্য পদোন্নতির অপেক্ষায়?
কতজন কর্মকর্তা জুনিয়রের অধীনে কাজ করছেন, অথচ তাদের পদোন্নতি আটকে থাকার কারণ আজও স্পষ্ট নয়?
কতজনের ক্যারিয়ারে অতীতের একটি সিদ্ধান্তের প্রভাব আজও বহন করতে হচ্ছে?
বর্তমান সরকারের উচিত এখনই এসব অভিযোগ ও বঞ্চনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা। প্রতিশোধ নয়, পক্ষপাত নয়—প্রতিটি কর্মকর্তার চাকরির নথি, যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও প্রাপ্যতার ভিত্তিতে নিরপেক্ষ পর্যালোচনা।
কারও প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে যদি প্রশাসনিক ভুল সংশোধনের প্রয়োজন হয়, সেটি করা হোক। আবার কারও বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক কারণে পদোন্নতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত থাকলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো হোক।
কারণ বছরের পর বছর একজন যোগ্য কর্মকর্তা কেন বঞ্চিত থাকবেন—এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত প্রশাসনের ভেতরের ক্ষোভ পুরোপুরি দূর হবে না।
আর আফসারের অকালমৃত্যু যদি আমাদের সামনে কোনো শিক্ষা রেখে যায়, তা হলো—
কোনো কর্মকর্তার নীরব কষ্ট, দীর্ঘশ্বাস কিংবা বঞ্চনার অভিযোগ যেন তার জীবদ্দশাতেই শোনা হয়; মৃত্যুর পর নয়।