পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, জাকাত দেন, রোজা রাখেন, হজ ও উমরাহ পালন করেন, এককথায়–প্র্যাকটিসিং মুসলিম; এমন অনেক মানুষকে পাওয়া যাবে, যাদের রিজিক সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান নেই। অথচ রিজিক ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৫ শতাংশ মুসলমানই রিজিক নিয়ে ধোঁকাগ্রস্ত। তারা জানেন, রিজিক মানেই টাকা-পয়সা। টাকা-পয়সা বা ধন-সম্পদ ছাড়া রিজিকের আর কোনো স্তর বা উপাদানের সঙ্গে তাদের পরিচয় নেই।
আসুন, আমরা এবার কোরআন-হাদিসের আলোকে রিজিকের বিভিন্ন স্তর বা রিজিকের বিভিন্ন উপাদানের সঙ্গে পরিচিত হই এবং দেখার চেষ্টা করি–আল্লাহতায়ালা কত প্রকারের রিজিকের বারিধারায় আমাদের সিক্ত করে রেখেছেন অথচ আমরা জানিই না, এগুলো রিজিকের স্তর বা উপাদান।
রিজিকের সর্বনিম্ন স্তর হচ্ছে টাকা-পয়সা, ধনদৌলত অর্থাৎ আর্থিক সচ্ছলতা। আমরা যেটাকে রিজিকের একমাত্র এবং সর্বোচ্চ স্তর ভাবি এটি হচ্ছে রিজিকের সর্বনিম্ন স্তর। সমাজে যারা আর্থিকভাবে সচ্ছল তাদের বেশি রিজিকপ্রাপ্ত এবং যারা আর্থিকভাবে অসচ্ছল তাদের কম রিজিকপ্রাপ্ত ভাবা হয়। অথচ ধন-সম্পদ বা টাকা-পয়সা হলো রিজিকের সর্বনিম্ন স্তর।
বিশ্ববিখ্যাত গবেষক শায়খ মুহাম্মাদ মুতায়াল্লি আশ-শারায়ি (রহ.) তার এক গবেষণায় লিখেছেন, ধন-সম্পদ বা টাকা-পয়সা অর্জন করা রিজিকের সর্বনিম্ন স্তর, সুস্বাস্থ্য বা শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা রিজিকের সর্বোচ্চ স্তর, নেককার স্ত্রী ও ধার্মিক বা দ্বীনদার সন্তান রিজিকের সর্বোত্তম স্তর এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি নসিব হওয়ার রিজিকের পরিপূর্ণ স্তর। রিজিকের স্তরগুলোর আলোচনা তুলে ধরা হলো–
১. সর্বনিম্ন স্তর–আর্থিক সচ্ছলতা
রিজিক বলতে শুধু ধন-সম্পদ বোঝা এবং সেই বোঝার ওপর অটল থাকা একেবারেই অজ্ঞতার পরিচয়। যে সম্পদ উপার্জনের নেশায় আমরা ডুবে থাকি, কোরআন-হাদিসে তাকে বলা হয়েছে ফেতনা বা পরীক্ষা–
আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, জেনে রাখো, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি ফেতনা বা পরীক্ষা। (সুরা আনফাল, ২৮)
কাব ইবনে ইয়াজ (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রত্যেক উম্মতের জন্য কিছু ফেতনা ছিল আমার উম্মতের জন্য ফেতনা হচ্ছে টাকা-পয়সা। (তিরমিজি, ২৩৩৯; মুসনাদে আহমাদ, ১৭৪৭১) যে জিনিসটাকে আল্লাহ ও রাসুলুল্লাহ (সা.) ফেতনা বলেছেন–সেই জিনিসটা সর্বোত্তম রিজিক হতে পারে না।
২. সর্বোচ্চ স্তর–সুস্বাস্থ্য বা শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা
ধন-সম্পদের চেয়েও সুস্থতা অধিক উত্তম। সুস্বাস্থ্যই সব সুখের মূল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তাকওয়ার অধিকারী মানুষের ধন-সম্পদের মালিক হওয়াতে কোনো দোষ নেই। আর তাকওয়াবান মানুষের জন্য ধন-সম্পদের চেয়ে সুস্থতা অধিক উত্তম। আর মনের প্রফুল্লতাও নেয়ামত। (ইবনে মাজাহ, ২১৪১; মুসনাদে আহমাদ, ২৩১৫৮; আল-আদাবুল মুফরাদ, ৩০১)
সুস্বাস্থ্য রিজিকের সর্বোচ্চ স্তর–কীভাবে? ধরুন আপনি ১০০ কোটি টাকার মালিক কিন্তু আপনার এমন একটা রোগ হয়েছে, আপনি কিছু খেতে পারছেন না; কিছু ব্যবহারও করতে পারছেন না–আইসিইউতে পড়ে থাকতে হচ্ছে, তাহলে ওই ১০০ কোটি টাকার কোনো মূল্য আছে? নেই। সুতরাং সুস্বাস্থ্য বা শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা মানুষের জীবনের সর্বোচ্চ রিজিক। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, দুটি নেয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ বা বেশির ভাগ মানুষ ধোঁকাগ্রস্ত। তা হলো–সুস্থতা ও অবসর। (বুখারি, ৬৪১২; তিরমিজি, ২৩০৪)
৩. সর্বোত্তম স্তর–পুণ্যবতী স্ত্রী ও নেককার সন্তান-সন্ততি
একজন স্বামীর জন্য পৃথিবীর সর্বোত্তম সম্পদ পুণ্যবতী স্ত্রী, আর একজন স্ত্রীর জন্য পৃথিবীর সর্বোত্তম সম্পদ পুণ্যবান স্বামী। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, পার্থিব জগতের পুরোটাই উপভোগের বস্তু। আর এই জগতের সর্বোত্তম উপভোগের বস্তু হলো পুণ্যবতী স্ত্রী। (মুসলিম, ১৪৬৭; মুসনাদে আহমাদ, ৬৫৬৭)
নেক সন্তানও আল্লাহর পক্ষ থেকে সর্বোত্তম উপহার–তিনি ইরশাদ করেছেন, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দুনিয়ার জীবনের শোভা। (সুরা কাহাফ, ৪৬)
একজন মানুষ অনেক টাকা-পয়সার মালিক, অঢেল সম্পদ, বাড়ি-গাড়ির অভাব নেই কিন্তু ঘরের বউ তার কোনো কথা শোনে না, তাকে পাত্তাই দেয় না–তার সব শান্তি ধুলোয় মিশে যায়। এর চেয়ে বড় অশান্তি আর কিছু নেই। ঘরের বউ ভালো হলে, নেককার হলে স্বামীর অনুগত হলে জীবনটা জান্নাতি জীবনে পরিণত হয়ে যায় আর ঘরের বউ বদকার হলে জীবনটা জাহান্নামে পরিণত হয়ে যায়।
৪. পরিপূর্ণ স্তর–আল্লাহর সন্তুষ্টি
প্রত্যেক মুমিন-মুসলমানের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন–আর আল্লাহর সন্তুষ্টিই সবচেয়ে বড়, এটাই সবচেয়ে বড় সাফল্য। আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, আর আল্লাহর সন্তুষ্টি হচ্ছে সবচেয়ে বড় নেয়ামত। এটিই মহাসফলতা। (সুরা তাওবা, ৭২)।
আয়েশা (রা.) বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষের অসন্তুষ্টির তোয়াক্কা না করে যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে, আল্লাহ তাকে মানুষের দুঃখ-কষ্ট থেকে বাঁচাতে যথেষ্ট হয়ে যান। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর অসন্তুষ্টির তোয়াক্কা না করে মানুষের সন্তুষ্টি কামনা করে, আল্লাহ তাকে মানুষের দায়িত্বেই ছেড়ে দেন। (তিরমিজি, ২৪১৪)
৫. আবশ্যক স্তর–ঈমান ও হেদায়েত
মুসলিমের জীবনে ঈমান ও হেদায়েত অর্জনের চেয়ে বড় কোনো রিজিক নেই–এটা আবশ্যক রিজিক। ঈমান ছাড়া কোনো আমল আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, আর যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন গ্রহণ করতে চাইবে কক্ষনো তার সেই দ্বীন কবুল করা হবে না এবং আখিরাতে সে ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। (সুরা আলে ইমরান, ৮৫)
কারও যদি ঈমান না থাকে, কেউ যদি হেদায়েত না পায়–তাহলে তার মতো দুর্ভাগা আর কেউ নেই। আর যার ঈমান নসিব হয়েছে তার মতো সৌভাগ্যবান কেউ নেই। উসমান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি এই কথা জেনে ও বিশ্বাস করে মৃত্যুবরণ করে যে আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (মুসলিম, ২৬)
ঈমান এবং হেদায়েত হচ্ছে রিজিকের আবশ্যক স্তর মানে আপনি যদি ঈমান এবং হেদায়েতপ্রাপ্ত হন তাহলে আপনি ধরে নেবেন আপনি রিজিকের আবশ্যক স্তরটা পেয়ে গেছেন আলহামদুলিল্লাহ। আর দুনিয়ার জীবনের এই আবশ্যক স্তরই আখিরাতের রিজিক পাওয়ার পূর্বশর্ত। ঈমান না থাকলে দুনিয়ার রিজিক পাওয়া গেলেও আখিরাতের রিজিক থেকে চিরবঞ্চিত থাকতে হবে।
জ্ঞান বা হিকমা এবং মানুষের ভালোবাসাও রিজিক আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, তিনি যাকে ইচ্ছা প্রজ্ঞা দান করেন। আর যাকে প্রজ্ঞা দান করা হয়, তাকে প্রভূত কল্যাণ দেওয়া হলো। (সুরা বাকারা, ২৬৯)
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন জিবরাইলকে ডেকে বলেন, আমি অমুক বান্দাকে ভালোবাসি, তুমিও তাকে ভালোবাসো। জিবরাইলও তাকে ভালোবাসেন, এরপর আসমানে ঘোষণা দেন–আল্লাহ অমুক বান্দাকে ভালোবাসেন, তোমরাও তাকে ভালোবাসো। তখন আসমানবাসীও তাকে ভালোবাসেন, আর পৃথিবীতেও তাকে গ্রহণযোগ্য করে দেওয়া হয়। (বুখারি, ৭৪৮৫)