বগুড়া থেকে নতুন বিদ্যুৎ প্রযুক্তির আলোচনায় এসেছে পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ)। দীর্ঘদিনের গবেষণার পর ফ্লাইহুইল প্রযুক্তি ব্যবহার করে কম খরচে বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরির দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, পরীক্ষামূলক পর্যায়ে সাফল্যের পর ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তিতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় প্রায় ১ টাকা ৫০ পয়সায় নামিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
আরডিএর এই উদ্যোগ সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা, বিদ্যুতের উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং দীর্ঘদিনের কুইক রেন্টাল ও ক্যাপাসিটি চার্জ বিতর্কের মধ্যে প্রযুক্তিটিকে অনেকে সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসেবে দেখছেন।
তবে প্রযুক্তিটির প্রকৃত সক্ষমতা নিয়ে এখনো বিস্তারিত স্বাধীন কারিগরি যাচাই প্রয়োজন।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আরডিএ বগুড়া প্রায় ১২ বছর ধরে ফ্লাইহুইলভিত্তিক একটি বিদ্যুৎ প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করছে। গত ১৬ আগস্ট এর একটি পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফল হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। পরবর্তী ধাপে ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি পূর্ণাঙ্গ প্ল্যান্ট নির্মাণের কাজ চলছে, যার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা।
প্রকল্পটি বাস্তবে কতটা বিদ্যুৎ দিতে পারবে, দীর্ঘ সময় চালালে প্রতি ইউনিটে প্রকৃত ব্যয় কত হবে এবং সিস্টেমটির দক্ষতা কত—এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে বড় পরিসরের পরীক্ষার পর।
এখানেই রয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফ্লাইহুইল প্রযুক্তি মূলত শক্তি সঞ্চয়ের একটি ব্যবস্থা। সাধারণ ফ্লাইহুইল সিস্টেমে বিদ্যুৎ দিয়ে একটি মোটর ঘুরিয়ে ভারী রোটরকে উচ্চ গতিতে ঘোরানো হয়। এতে বিদ্যুৎ শক্তি যান্ত্রিক গতিশক্তি হিসেবে সঞ্চিত থাকে। প্রয়োজনের সময় সেই ঘূর্ণন জেনারেটর চালিয়ে আবার বিদ্যুৎ হিসেবে ফেরত দেওয়া হয়। মার্কিন জ্বালানি বিভাগের একটি প্রদর্শনী প্রকল্পেও ফ্লাইহুইলকে বৈদ্যুতিকভাবে চার্জ ও ডিসচার্জযোগ্য শক্তি-সঞ্চয় ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
গবেষণালব্ধ তথ্য অনুযায়ী, ফ্লাইহুইলের সঞ্চিত শক্তি নির্ভর করে এর ভরবেগ এবং ঘূর্ণনগতির ওপর। অর্থাৎ বাইরে থেকে শক্তি না দিলে ফ্লাইহুইল অনির্দিষ্টকাল ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে না। ঘর্ষণ, বেয়ারিং, মোটর-জেনারেটর ও পাওয়ার কনভার্টারের বিভিন্ন ক্ষতির কারণে আউটপুট শক্তি সাধারণত ইনপুট শক্তির চেয়ে কম হয়।
তাই আরডিএর প্রযুক্তি যদি সত্যিই কোনো বাহ্যিক জ্বালানি ছাড়াই ধারাবাহিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হয়, তাহলে তার শক্তির উৎস এবং সম্পূর্ণ energy balance প্রকাশ করা হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন।
প্রতি ইউনিট মাত্র ১ টাকা ৫০ পয়সায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের দাবি নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। কিন্তু এখানে শুধু যন্ত্র চালানোর তাৎক্ষণিক খরচ নয়—প্রকল্পের মূলধনী ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ, মোটর-জেনারেটর ও পাওয়ার ইলেকট্রনিকসের ক্ষতি, বেয়ারিং, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, জমি, অবচয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়ও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।
২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ মেগাওয়াট প্ল্যান্ট নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সেটি কত ঘণ্টা পূর্ণ ক্ষমতায় চলবে এবং বছরে কত ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে—এই তথ্যের ভিত্তিতেই প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে কুইক রেন্টাল কেন্দ্র ও ক্যাপাসিটি চার্জ দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের বিষয়। সাম্প্রতিক সংসদীয় তথ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগের সরকারের সময়ে কুইক রেন্টাল প্রকল্প অনুমোদনে বিশেষ আইনি কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছিল এবং এতে অস্বাভাবিক উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জের সুযোগ তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই আইনটি পরবর্তীতে বাতিল করা হয়েছে।
এ ছাড়া একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে রাজশাহীর একটি কুইক রেন্টাল কেন্দ্রকে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও ৬৬৭ কোটি টাকার বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
তবে এসব তথ্যের ভিত্তিতে সরাসরি বলা যায় না যে কোনো নির্দিষ্ট ‘সিন্ডিকেট’ আরডিএর প্রযুক্তি ঠেকাতে চাইছে। এমন অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া তা সংবাদে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
ফ্লাইহুইল প্রযুক্তি নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ার যেমন সুযোগ নেই, তেমনি সম্ভাবনাময় গবেষণাকে শুরুতেই বাতিল করারও কারণ নেই। বরং সরকারের উচিত হতে পারে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে প্রযুক্তিটির পূর্ণাঙ্গ কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন করা।
পরীক্ষায় অন্তত পাঁচটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার—প্রথমত, শক্তির প্রকৃত উৎস কী; দ্বিতীয়ত, ইনপুট ও আউটপুট শক্তির পরিমাণ কত; তৃতীয়ত, ধারাবাহিকভাবে ২৪ ঘণ্টা চালালে কর্মদক্ষতা কত; চতুর্থত, প্রতি ইউনিটের পূর্ণাঙ্গ levelized cost কত; এবং পঞ্চমত, ১ মেগাওয়াট থেকে ভবিষ্যতে ১০০ বা ১,০০০ মেগাওয়াটে প্রযুক্তিটি সম্প্রসারণ করা প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিকভাবে সম্ভব কি না।
ফ্লাইহুইল প্রযুক্তি বিশ্বে ইতোমধ্যে শক্তি সঞ্চয় ও গ্রিড স্থিতিশীলতায় ব্যবহৃত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগও গ্রিড-স্কেল ফ্লাইহুইলভিত্তিক energy-storage প্রকল্প নিয়ে কাজ ও প্রদর্শনী করেছে।
বগুড়ার আরডিএর উদ্যোগ সফল হলে এটি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগত অর্জন হতে পারে। বিশেষ করে যদি কম মূল্যে, দীর্ঘমেয়াদে এবং নিরাপদভাবে শক্তি সঞ্চয় ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়, তাহলে সৌর ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎসের সঙ্গে ফ্লাইহুইল প্রযুক্তির সমন্বয়ও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
তবে “জ্বালানি ছাড়াই বিদ্যুৎ” এবং “প্রতি ইউনিট ১ টাকা ৫০ পয়সা”—এই দুই দাবিকে বড় পরিসরে স্বাধীন পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। কারণ ফ্লাইহুইলের প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক নীতি হলো শক্তি সঞ্চয় ও পরে তা ফেরত দেওয়া, শক্তির শূন্য উৎস থেকে নতুন শক্তি সৃষ্টি করা নয়।
সুতরাং সরকারের সবচেয়ে যৌক্তিক পদক্ষেপ হতে পারে—রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক স্বার্থের বাইরে থেকে প্রকল্পটিকে কঠোর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার আওতায় আনা। পরীক্ষায় দাবি সত্য প্রমাণিত হলে দ্রুত বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণের পথ খুলে দেওয়া, আর হিসাব না মিললে কোথায় প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে তা স্পষ্ট করা। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে এমন একটি সম্ভাবনাময় গবেষণার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এখন প্রচার নয়—স্বচ্ছ পরীক্ষা ও প্রমাণ।