এ যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নেবার চমৎকার সুযোগ তৈরি হয়েছে চীনের। তারা প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণ এবং প্রতিরোধের খুঁটিঁনাটি বিশ্লেষণ করে এর দুর্বলতা বের করতে সচেষ্ট। সিএনএনকে চীনের কিছু সামরিক কর্মকর্তা বলেন, পারস্য উপসাগরের এই যুদ্ধ চীনকে ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সম্ভাব্য যুদ্ধের স্বরূপ কেমন হতে পারে তা বোঝাচ্ছে।
চীনের বিমান বাহিনীর এক সাবেক কর্ণেল ফু কিয়ানশাও বলেন, এই যুদ্ধ থেকে তার প্রধান উপলব্ধি হলো পিপল লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) কখনোই প্রতিরক্ষা ভুলে যাওয়া যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী সিস্টেম বিশেষত প্যাট্রিয়ট এবং টার্মিনাল হাই অ্যালটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড)। ফু আরো বলেন, আমাদেরকে অনেক বেশি মনোযোগ দিতে হবে প্রতিরক্ষার দুর্বলতা নিয়ে, যেন ভবিষ্যতের যুদ্ধে আমরা অপ্রিতিরোধ্য থাকতে পারি। পিএলএ সম্প্রতিক সময়ে আক্রমণের জন্য অস্ত্র সংগ্রহ করেছে অধিক পরিমাণে। বিশেষত রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম এমন ক্ষেপণাস্ত্র এবং সেগুলো নিক্ষেপের লঞ্চার। পিএলএ অন্তত পঞ্চম প্রজন্মের ১০০০ জে-২০ ফাইটার জেট প্রস্তুত করেছে। এগুলো সংখ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫এস এর সমসংখ্যক এবং দূরপাল্লায় নিখুঁত আক্রমণ চালাতে পারে। চীনের নিকট দূরপাল্লার রাডার ফাঁকি দেয়ার বোমারু বিমান রয়েছে যা যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ বা বি ২১ বোমারু বিমানের মতোই কার্যকর।
তবে প্রতিরক্ষা আলাদা ব্যাপার বলেও জানান তিনি। বিশ্লেষকদের মতে ইরান পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিসমূহে আক্রমণ করে ক্ষতি করতে সক্ষম হয়েছে তুলনামূলক পুরোনো প্রজন্মের অস্ত্র নিয়েই। স্বল্প খরচের শাহেদ ড্রোন এবং মিসাইল ব্যবহার করেছে তারা। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র অনেক উন্নত এবং আধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বি-১ এস, বি-২এস। তারা ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার, নৌযান এমনকি সেতু সমূহে এসব অস্ত্র ব্যবহার করেছে। এসব বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই পরিকল্পনা করতে হবে।
তাইওয়ান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছে এবং এটি হতে পারে ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্র। চীন সরকার তাইওয়ানকে নিজেদের কব্জায় রাখতে চায়। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র চীনের প্রভাব বাড়ুক তা যেকোনো মূল্যে প্রতিহত করতে প্রস্তুত। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সরাসরি সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে ইচ্ছুক না। তবে নিজেদের পছন্দের সরকার বসিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে চান তিনি। তাইওয়ানে চীন আধুনিক অস্ত্র এবং কমদামী কার্যকর অস্ত্র উভয়ের সমন্বয় করেছে। চীন পৃথিবীর শীর্ষ ড্রোন নির্মাতা। তাদের বেসামরিক ড্রোন নির্মাতারা বছরে ১০০ কোটি ড্রোন বানাতে সক্ষম যা খুব সহজেই অস্ত্রে রূপান্তর করা সম্ভব বলে মন্তব্য করে বিশ্লেষক প্লাটফর্ম ওয়্যার অন দ্যা রক। ড্রোন সামরিক প্রতিরক্ষার খরচ অনেক বাড়িয়ে দেয়। তাইওয়ানের ফ্লাগশীপ ড্রোন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান থান্ডার টাইগারের প্রধান নির্বাহী জেন সু বলেন, আমাদের দিনরাত এক করে সবসময় উৎপাদন করে যেতে হবে যেন আমরা শত্রুদের প্রতিরোধ করতে পারি। ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় শিক্ষা। এই যুদ্ধে তারা প্রকারান্তে চীন এবং রাশিয়ার সঙ্গেও লড়াই করেছে। তাদের রণকৌশলে বড় পরিবর্তন আনতে হবে। আক্রমণের পাশাপাশি রক্ষণের গুরুত্ব ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের বড় মাথাব্যাথা হতে পারে। ইরান যুদ্ধ থেকে প্রতিটি দেশের সেনারা এই শিক্ষাই নিচ্ছে যে শত্রুরাও শিখছে এবং সেই শিক্ষা হয়তো এমনভাবে প্রয়োগ করা হবে যেমনটা আশা করা হয়নি। যেমনটা ধারণা করা হয় ইরান যুদ্ধের আগে ওয়াশিংটন ধারণা করেনি তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিবে।
চীনের আর্মির একটি দুর্বলতা হলো ১৯৭৯ সালের কোরিয়া যুদ্ধের পর তারা আর কোন আক্রমণের স্বীকার হয়নি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক যুদ্ধে লিপ্ত ছিলো। চীনের সামরিক বিশ্লেষক সং জংপিং ইরান যুদ্ধকে ইঙ্গিত করে বলেন, এটি আসল রণক্ষেত্র কেমন তা বোঝায়। যদি আগামী দশকের মাঝে চীনের সঙ্গে কোন লড়াই হয় তবে ওয়াশিংটন এই যুদ্ধে যুক্ত অনেককেই ফিরিয়ে এনে সংযুক্ত করবে সামরিক ক্ষেত্রে। ইরান যুদ্ধ থেকে আরেকটি শিক্ষ হলো এক রাতের মধ্যে একটি দেশের প্রেসিডেন্টকে তুলে নিলেও কিভাবে টিকে থাকা যায়। যেমনটা করতে ব্যর্থ হয়েছে ভেনেজুয়েলা। এছাড়াও যুদ্ধের ফলে যে বৈশ্বিক প্রভাব পরে তাও সবসময় মাথায় রাখতে হবে।