• রবিবার, ১৭ মে ২০২৬, ০১:০১ অপরাহ্ন
Headline
নদীর প্রবাহ পথে ক্ষীণ জলধারা দেখা গেলেও নদীর বেশির ভাগ অংশই ধু-ধু বালু চর-দায় কার! শিশুদের অধিকার ও প্রত্যাশা : জাতিসংঘ ঘোষিত পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী অভিযানে অস্ত্রসহ ইউপিডিএফের তিন সন্ত্রাসী আটক হটস্পট ৩০ উপজেলায় কমেছে দ্রুত হামের সংক্রমণ ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট কৃষিবান্ধব ও উৎপাদনমুখী হওয়া প্রয়োজন–লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল আলোচনায় যেসব ইস্যু : বাংলাদেশ সফরে আসতে পারেন শেহবাজ শরিফ, ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সরব হলে দেশ ও জাতির উপকার হতো’ : ‘ধর্ষণ ও শিশুমৃত্যু পর্দার নায়কের হাতে সম্মাননা পেলেন বাস্তবের নায়করা : চড়াই-উতরাই পাকিস্তানের বিপক্ষে টস হেরে প্রথমে ব্যাটিংয়ে স্বাগতিক বাংলাদেশ ২৬ ওভারে ৩ উইকেটে ১০১ রান নিয়ে মধ্যাহ্ন বিরতিতে বাংলাদেশ

শিশুদের অধিকার ও প্রত্যাশা : জাতিসংঘ ঘোষিত

শিশু অধিকার সংরক্ষণ ডেস্ক. / ৫০ Time View
Update : রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬

‘শিশু অধিকার সনদে’ শিশুদের বেঁচে থাকা, বেড়ে ওঠা, নিরাপত্তা, অংশগ্রহণ এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক কারণে আমাদের সমাজে এসব অধিকারের পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো সম্ভব হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শিশুকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই তার পারিবারিক, সামাজিক ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্বব্যাপী শিশুদের অধিকার সংরক্ষণের ধারণা প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে উঠে আসে ১৯২৪ সালে জেনেভা ঘোষণার মাধ্যমে। পরে ১৯৫৯ সালে জাতিসংঘ ‘ডিক্লারেশন অব দ্য রাইটস অব দ্য চাইল্ড’ বা শিশু অধিকার ঘোষণা গ্রহণ করে। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ‘কনভেনশন অন দ্য রাইটস অব দ্য চাইল্ড’ বা ‘শিশু অধিকার সনদ’ গৃহীত হয়, যা ১৯৯০ সালে কার্যকর হয়।

বাংলাদেশ একই বছর এই সনদে স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করে। বর্তমানে বাংলাদেশের আইনে ১৮ বছরের নিচের সকল ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

শিশু অধিকার সনদে মোট ৫৪টি ধারা রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, শিশুদের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্য করা যাবে না এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। রাষ্ট্রকে শিশুদের পরিচর্যা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শিশুদের মত প্রকাশ, তথ্যপ্রাপ্তি ও অংশগ্রহণের অধিকারও স্বীকৃত হয়েছে।

শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। বিশ্বে মোট জনসংখ্যার বড় একটি অংশ শিশু-কিশোর। বাংলাদেশেও জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশ শিশু। তবে তাদের একটি বড় অংশ এখনও দারিদ্র্য, অপুষ্টি, নিরক্ষরতা ও সামাজিক বৈষম্যের মধ্যে বেড়ে উঠছে। বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে দেখা যায়, দরিদ্র পরিবারের বহু শিশু নিরাপদ বাসস্থান, বিশুদ্ধ খাদ্য, স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়।

শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, দারিদ্র্য শিশু অধিকার বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি। দরিদ্র পরিবারের শিশুরা প্রায়ই অপুষ্টি, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং শিক্ষাবঞ্চনার শিকার হয়। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে শহরের বস্তি ও দুর্গম গ্রামীণ এলাকায় বসবাসকারী শিশুদের অবস্থা তুলনামূলকভাবে আরও নাজুক।

‘বাংলাদেশে শিশুশ্রম পরিস্থিতি’ বিষয়ক বিভিন্ন গবেষণায় শিশুশ্রমের প্রধান কারণ হিসেবে চরম দারিদ্র্য, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যু, পিতামাতার বিচ্ছিন্নতা, পরিবারে আর্থিক সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের আর্থিক চাপ কমাতে শিশুদের অল্প বয়সেই শ্রমে যুক্ত হতে হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুশ্রম শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি একটি মানবাধিকার সংকট। কারণ শিশুশ্রম শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক শৈশবকে বাধাগ্রস্ত করে। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করার কারণে অনেক শিশু দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়।

চিকিৎসকদের মতে, শিশুরা দীর্ঘদিন ধরে হোসিয়ারি শিল্পকারখানা বা ধুলিময় পরিবেশে কাজ করলে শ্বাসকষ্ট, ব্রংকাইটিসসহ বিভিন্ন শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এছাড়া ওয়ার্কশপ বা ধাতব কারখানায় মেটাল ডাস্টের মধ্যে কাজ করলে তাদের ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘমেয়াদে জটিল রোগের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী ১৪ বছরের নিচের শিশুদের শ্রমে নিয়োগ নিষিদ্ধ। এছাড়া ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগের ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। শিশু আইন ও শ্রম আইনেও শিশুদের সুরক্ষার বিষয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই এসব আইন পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না।

শিশু অধিকার সংরক্ষণ ও শিশু কল্যাণ নিশ্চিত করতে শিশুর সুপ্ত প্রতিভা বিকাশ, পুষ্টি, শিক্ষা ও বিনোদনের কোনো বিকল্প নেই। তাই সরকার শিশু-কিশোর কল্যাণে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা সম্প্রসারণ, শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ, কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণ, শিশুর জীবনমান উন্নয়ন এবং দক্ষতা বিকাশমূলক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম।

শিশু স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় সরকার ২০১১ সালে ‘জাতীয় শিশু নীতি’ গ্রহণ করে। এছাড়া নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে ‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০’ প্রণয়ন করা হয়েছে। শিশুশ্রম নিরসনের জন্য ‘জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি ২০১০’ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

সরকার ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম কমাতে বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালনা করছে। এসব প্রকল্পের আওতায় ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুদের শ্রম থেকে সরিয়ে এনে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও পুনর্বাসনের আওতায় আনা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানো গেলে শিশুরা ভবিষ্যতে আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারবে।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে। শিশুদের প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, শিশুরা যখন শিক্ষিত ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে, তখন সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। তাই শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা দেশের টেকসই উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত।

আইন অনুযায়ী ১৮ বছর পর্যন্ত সবাই শিশু। তাই ১৮ বছরের আগে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে শিশুর শিক্ষা, পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কার্যকর আইন প্রয়োগ, দারিদ্র্য হ্রাস এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে একদিন ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমমুক্ত ও শিশুবান্ধব সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা