২০২৪ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) যৌথ গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ এনজিও নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশনের (বিএনএনআরসি) মতে, প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের জীবন সহজ করলেও এর অপব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। অনলাইনে ব্ল্যাকমেইল, পরিচয় জালিয়াতি, ছবি বিকৃতি ও ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের মতো অপরাধের মাধ্যমে নারীরা সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। এছাড়া সাইবার স্টকিং, সাইবার বুলিং, ডক্সিং, হ্যাকিং, ইমেজ বেজড অ্যাবিউজ ও চাইল্ড গ্রুমিংয়ের ঘটনাও বাড়ছে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) মহাপরিচালক মো. মেহেদী-উল-সহিদ জানান, গত বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণের জন্য ১৩ হাজার ২৩টি আবেদন পেয়েছে বিটিআরসি। এর মধ্যে ১২ হাজারের বেশি কনটেন্ট অপসারণ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের প্রায় ৯০ শতাংশই নারী।
পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাইবার অপরাধের শিকার ৬০ হাজার ৮০৮ জন নারী তাদের কাছে প্রতিকার চেয়েছেন। এর মধ্যে ৪১ শতাংশ নারী ডক্সিংয়ের শিকার হয়েছেন। এছাড়া ১৮ শতাংশ ফেসবুক আইডি হ্যাক, ১৭ শতাংশ ব্ল্যাকমেইলিং, ৯ শতাংশ ইমপারসোনেশন এবং ৮ শতাংশ সাইবার বুলিংয়ের অভিযোগ করেছেন।
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ আজিজুল হক বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে দেশে কয়েকটি আইন থাকলেও সেগুলো সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং পরিবার ও সমাজভিত্তিক সচেতনতা তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
আইনি সহায়তা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাসুদা ইয়াসমিন জানান, দেশের প্রতিটি জেলা আদালতে আইনি সহায়তা কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া ১৬৬৯৯ নম্বরে কল করেও যে কেউ আইনি সহায়তা ও পরামর্শ নিতে পারেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুমন আহমেদ বলেন, অনলাইনে সবচেয়ে বেশি ডক্সিংয়ের (বাসার ঠিকানা, ফোন নম্বর ইত্যাদি অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করে হুমকি দেওয়া) শিকার হন নারীরা। এ হার ৪৮ শতাংশ। পুলিশের সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের হটলাইন নম্বর ০১৩২০০০০৮৮৮, ফেসবুক পেজ Police Cyber Support for Women-PCSW ই-মেইল cybersupport.women@police.gov.bd ব্যবহার করে সহিংসতার শিকার নারীরা অভিযোগ জানাতে পারেন বলেও জানান তিনি।
বেসরকারি সংস্থা বিএনএনআরসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম বজলুর রহমান বলেন, সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের জন্য বিদ্যমান সরকারি সহায়তা সেবাসমূহ সম্পর্কে জনসাধারণকে জানানো জরুরি। পরিবার থেকেই অনেক সময় সহিংসতার শিকার ব্যক্তির প্রথম বাধা আসে, তাই পরিবার ও সমাজকে সচেতন করতে গণমাধ্যমেরও জোরালো ভূমিকা প্রয়োজন। প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের এ সময়ে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার নতুন ও জটিল রূপগুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবা, আলোচনা এবং প্রতিরোধ ও প্রতিকারের বাস্তবসম্মত পথ খুঁজে বের করতে হবে। প্রতিরোধ, সুরক্ষা, দ্রুত প্রতিকার ও ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা নিশ্চিত করতে এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন সহিংসতার ধরনও জটিল হচ্ছে। তাই প্রতিরোধ, দ্রুত প্রতিকার, আইনি সহায়তা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।