নিজস্ব প্রতিবেদক
দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাকে দ্রুততম সময়ে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১৫ জুন) নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আমিনুল ইসলাম বলেন, র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় বেনজীর আহমেদ অন্যতম আসামি। এছাড়া রাজধানীর শাপলা চত্বরের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যাকাণ্ডের মামলার অভিযোগপত্রও প্রস্তুত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “অসংখ্য গুমের ঘটনায় বেনজীর আহমেদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। ট্রাইব্যুনালের বাইরেও তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে।” তার বিরুদ্ধে জারি করা তিনটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানার নথি সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং পরবর্তী ধাপে তা ইন্টারপোলে পাঠানো হবে বলেও জানান তিনি।
চিফ প্রসিকিউটর আশা প্রকাশ করে বলেন, প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হতে প্রায় এক মাস সময় লাগতে পারে। এরপর সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার তাকে বাংলাদেশে ফেরত দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। দেশে ফিরিয়ে আনার পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করা হবে বলেও জানান তিনি।
এর আগে রোববার (১৪ জুন) সাবেক আইজিপির আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পরে সংবাদ সম্মেলনে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম জানান, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা ছয়টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে এবং অপর একটি মামলার বিচার চলছে।
দুদক সূত্র জানায়, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দায়ের করা পাঁচটি মামলায় তার বিরুদ্ধে ৭৬ কোটিরও বেশি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সরকারি কর্মকর্তা থাকা অবস্থায় সরকারি পাসপোর্ট ব্যবহার না করে সাধারণ নাগরিক হিসেবে একাধিক পাসপোর্ট গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
দুদকের আবেদনের পর বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ইন্টারপোলের কাছে রেড নোটিশ জারির আবেদন করে। এর ধারাবাহিকতায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, গত ১২ জুন বাংলাদেশ পুলিশ দুবাই থেকে ই-মেইলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারের তথ্য পায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইন অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠাতে হবে।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে এনসিবি ঢাকা আন্তর্জাতিক সমন্বয়, রেড নোটিশ-সংক্রান্ত কার্যক্রম এবং গ্রেপ্তার-পরবর্তী ফলোআপ সম্পন্ন করছে। দুদক প্রয়োজনীয় মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও তদন্ত-সংক্রান্ত নথিপত্র প্রস্তুত করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর কূটনৈতিক চ্যানেলে প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠানো হবে।
২০২৪ সালে দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর বেনজীর আহমেদ দেশ ত্যাগ করেন। পরে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ পুলিশের আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার ও র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
উল্লেখ্য, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র র্যাবের কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সেই তালিকায় বেনজীর আহমেদের নামও ছিল।