দুই দেশের সম্পর্ক শ্রমবাজার থেকে বিস্তৃত হতে পারে অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে
ঢাকা: দুই দিনের সরকারি সফরে আজ মালয়েশিয়া গেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি তাঁর প্রথম দ্বিপক্ষীয় বিদেশ সফর। সফরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে একান্ত বৈঠক, প্রতিনিধিদল পর্যায়ের আলোচনা এবং উচ্চপর্যায়ের একাধিক বৈঠকে অংশ নেবেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে সরকার ও ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘদিনের শ্রমবাজারনির্ভর বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক এবার বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, শিক্ষা, হালাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তি সহযোগিতার মতো নতুন ক্ষেত্রে আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।
পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, সফরে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) টার্মস অব রেফারেন্স-সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক সহযোগিতা নিয়েও আরেকটি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে।
তিনি বলেন, দুই দেশের সরকারপ্রধানের বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, শিক্ষা, কৃষি, জ্বালানি, হালাল শিল্প এবং সেমিকন্ডাক্টরসহ সম্ভাবনাময় বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয় গুরুত্ব পাবে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন খাতে নতুন বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ, আসিয়ান সদস্যপদে বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে মালয়েশিয়ার সমর্থনের বিষয়ও আলোচনায় থাকবে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। দেশটি বাংলাদেশের বড় শ্রমবাজারের পাশাপাশি জ্বালানি, পাম অয়েল, শিল্পের কাঁচামাল ও বিভিন্ন পণ্যের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, সিরামিক, ওষুধ ও কৃষিপণ্য রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। তবে দুই দেশের বাণিজ্যে এখনো বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে।
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মো. আনোয়ার শহীদ বলেন, নির্বাচিত সরকারের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর এই সফর কেবল কূটনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা যাবে।
তিনি বলেন, জনশক্তি খাতের বাইরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, কৃষি, শিক্ষা ও হালাল অর্থনীতির মতো খাতগুলোতে আরও বেশি সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। এবারের সফরের মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রে নতুন গতি আসতে পারে।
তিনি আরও বলেন, দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য থাকলেও বাংলাদেশের রপ্তানির অংশ তুলনামূলক কম। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল পণ্যসহ মূল্য সংযোজনকারী পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো গেলে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো সম্ভব।
মালয়েশিয়াপ্রবাসী ব্যবসায়ী ও বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহবুব আলম শাহ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে। মালয়েশিয়ার বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের উৎপাদনশিল্প, বিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি ও হালাল শিল্পে আগ্রহ রয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু শ্রমিক পাঠানোর পরিবর্তে দক্ষ কর্মী, প্রকৌশলী, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্যকর্মী পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এতে রেমিট্যান্স আয় বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের দক্ষ মানবসম্পদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে।
তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বড় সুযোগ রয়েছে। মালয়েশিয়ার উন্নত হালাল ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি ও মান নিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের খাদ্য, ওষুধ ও প্রসাধনী খাতের রপ্তানি বাড়তে পারে।
ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নেও দুই দেশের সহযোগিতার বড় সুযোগ রয়েছে। মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষা এবং শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশ যৌথভাবে কাজ করতে পারে।
তাদের মতে, সফরের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে পরবর্তী সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়নের ওপর। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির অগ্রগতি, বিনিয়োগ সহজীকরণ, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি সহযোগিতা এবং হালাল অর্থনীতিতে অংশীদারত্ব বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের পাঁচ দশকের বেশি সময় পর এবারের সফরকে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।