বিশ্বকাপে ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’ পুরস্কারটি একসময় মাঠের সেরা পারফরমারের স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে। ফুটবল বিশ্লেষকদের পাশাপাশি অনেক খেলোয়াড়ও মনে করছেন, পারফরম্যান্সের চেয়ে জনপ্রিয়তাই এখন এই পুরস্কার নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখছে।
চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামকে ২-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠার ম্যাচে স্পেনের তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’ নির্বাচিত হলেও পুরস্কার গ্রহণের সময় তার মধ্যে খুব একটা উচ্ছ্বাস দেখা যায়নি। একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে বসনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের মালিক টিলমানের মধ্যেও। অনেকের মতে, ফুটবলারদের এই সংযত প্রতিক্রিয়া পুরস্কারটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে।
বিশ্বকাপে প্রথম ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ পুরস্কার চালু করে ফিফা ২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপে। পরে ২০২২ সালে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’। ২০০২ ও ২০০৬ বিশ্বকাপে ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপের বিশেষজ্ঞরাই মাঠের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচন করতেন। সে সময় কৌশল, পারফরম্যান্স ও ম্যাচে প্রভাবই ছিল প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
তবে ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ থেকে নির্বাচন পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আসে। সমর্থকদের এসএমএস ও অনলাইন ভোটের মাধ্যমে ম্যাচসেরা নির্বাচন শুরু হয়। ২০১৪ বিশ্বকাপে ভোট হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, আর ২০২২ থেকে ফিফার অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের মাধ্যমে দর্শকদের ভোটেই নির্ধারিত হচ্ছে এই পুরস্কার।
সমালোচকদের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে পরিসংখ্যান ও প্রকৃত পারফরম্যান্সের চেয়ে তারকাখ্যাতি ও জনপ্রিয়তা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০২২ বিশ্বকাপে কানাডার বিপক্ষে ম্যাচ শেষে বেলজিয়ামের কেভিন ডি ব্রুইনাও স্বীকার করেছিলেন, তিনি মনে করেননি যে ওই ম্যাচে তিনিই সেরা ছিলেন; বরং নামের কারণেই পুরস্কারটি পেয়েছেন বলে মন্তব্য করেছিলেন।
চলমান বিশ্বকাপেও এমন কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো একটি পেনাল্টি গোল করলেও পুরো ম্যাচে খুব বেশি প্রভাব রাখতে পারেননি। এরপরও তাকে ম্যাচসেরা নির্বাচিত করা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
একইভাবে কেপ ভার্দের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়ে লিওনেল মেসি ম্যাচসেরা হন। যদিও ওই ম্যাচে লিসান্দ্রো মার্তিনেজ একটি গোল করার পাশাপাশি মেসির গোলে সহায়তা করেছিলেন। অনেকের মতে, ম্যাচে তার অবদানও সমানভাবে স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি রাখত।
ঘানার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের গোলশূন্য ড্রয়ের ম্যাচে জুড বেলিংহাম ম্যাচসেরা নির্বাচিত হলেও ঘানার রক্ষণভাগের দৃঢ় পারফরম্যান্স আলোচনার বাইরে থেকে যায়।
তবে বিতর্ক থাকলেও জনপ্রিয়তার বিচারে তারকাদের আধিপত্য অব্যাহত রয়েছে। চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত লিওনেল মেসি পাঁচ ম্যাচে চারবার ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’ হয়েছেন। তিনবার করে এই পুরস্কার পেয়েছেন জুড বেলিংহাম, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এবং আর্লিং হলান্ড।
বিশ্বকাপের ইতিহাসেও এই তালিকার শীর্ষে রয়েছেন লিওনেল মেসি। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৫ বার ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’ নির্বাচিত হয়েছেন আর্জেন্টিনার এই অধিনায়ক, যা এই পুরস্কারের ইতিহাসে অনন্য এক রেকর্ড।