নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বিদায় হজের ভাষণে মানব মর্যাদা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক অধিকারের যে মহান শিক্ষা উচ্চারিত হয়েছিল, তা আজও সমগ্র মানবজাতির জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সন্ধ্যায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে পক্ষকালব্যাপী ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-১৪৪৮ হিজরি উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বর্তমান বিশ্বে হিংসা, সংঘাত, অসহিষ্ণুতা, বৈষম্য, উগ্রতা, মিথ্যা ও নৈতিক অবক্ষয়ের যে বিস্তার ঘটছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য মহানবী (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, ‘বিভেদ, প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ কোনো জাতিকে শক্তিশালী করে না।’ অতীতের কর্তৃত্ববাদ, ফ্যাসিবাদ ও অন্যায় যেন আর কখনো ফিরে না আসে, সে জন্য মহানবী (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে ধর্মের শান্তি, ন্যায় ও সম্প্রীতির মর্মবাণী ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, সুশাসন ও মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শকে বিশ্ব মানবতার জন্য চিরন্তন পথনির্দেশনা হিসেবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাঁর চরিত্রে সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, ক্ষমাশীলতা, সহনশীলতা, মানবিকতা ও পরম মমত্ববোধের অনন্য সমন্বয় ঘটেছিল। দরিদ্র, এতিম, অসহায় ও নিপীড়িত মানুষের প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত মমতাশীল।
রাষ্ট্রপতি বলেন, মহানবী (সা.)-এর জীবনী থেকে শিক্ষা নিয়ে সমাজে মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে হবে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় সহাবস্থান নিশ্চিতের ক্ষেত্রেও মহানবী (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণীয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে পারস্পরিক অধিকার, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সম্প্রীতির যে দৃষ্টান্ত মহানবী (সা.) স্থাপন করেছেন, তা বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে অনুসরণ করা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, মহান আল্লাহ মানবজাতির হেদায়েত, মুক্তি ও কল্যাণের জন্য সর্বশেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। তাঁর আগমন মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় ঘটনা। তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ।
তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে ধর্মপ্রাণ মানুষ স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করবেন, সব ধর্মের মানুষ নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবনযাপন করবেন এবং ন্যায়বিচার, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য হবে রাষ্ট্র ও সমাজের ভিত্তি।’
এ সময় বাংলাদেশের ইসলামী সংস্কৃতির উন্নয়নে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ও অবদানের কথা উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ধর্মীয় নেতাদের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং তাঁদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি জানান, ইতোমধ্যে ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের মাসিক সম্মানী ভাতা দেওয়া শুরু হয়েছে। অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে সেবাদানকারীদেরও সম্মানী ভাতা প্রদানের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘২০৩০ সালের আগে প্রতিশ্রুতি অনুসারে দেশের সব মসজিদসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয় মাসিক সম্মানী ভাতার আওতায় আসবে।’
সমাজ থেকে দুর্নীতি, মাদক, সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, গুজব, হিংসা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং অসহিষ্ণুতা দূর করতে আলেম-ওলামাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ তুলে ধরে তরুণ প্রজন্মকে নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করতে আলেম-ওলামারা ভূমিকা রাখবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি।
বক্তব্য শেষে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-১৪৪৮ হিজরি উপলক্ষে পক্ষকালব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন রাষ্ট্রপতি। পরে ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে প্রকাশিত ‘সিরাত স্মরণিকা’র মোড়ক উন্মোচন করেন তিনি।
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক রাষ্ট্রপতিকে শুভেচ্ছা স্মারক হিসেবে ‘আল কুরআনুল করিম এনসাইক্লোপিডিয়া’র একটি সেট উপহার দেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করা হয়।
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শামীম কায়সার ও সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক স্বাগত বক্তব্য দেন।