নিজস্ব প্রতিবেদক | রংপুর
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় তদন্তভার কোতোয়ালি থানা থেকে গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়েছে। অধিকতর স্বচ্ছ তদন্ত ও দ্রুত অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়ার লক্ষ্যেই তদন্ত সংস্থা পরিবর্তন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ।
তবে তদন্তভার পরিবর্তনের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের ধরন, পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য এবং ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া আলামত নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকেও ঘটনাটির পেছনে আরও কেউ জড়িত থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে।
নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই ও মামলার বাদী গোপীনাথ চক্রবর্তী বলেছেন, বাড়িতে ঢুকে একই পরিবারের চারজনকে মাত্র দুজনের পক্ষে হত্যা করা সম্ভব নয়। তাঁর ধারণা, এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে বড় কোনো শক্তি কিংবা নেপথ্য ঘটনা থাকতে পারে।
মঙ্গলবার দুপুরে নগরীর মাছুয়াপাড়ার বাড়িতে নিহতদের শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান শুরুর আগে সাংবাদিকদের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে গোপীনাথ চক্রবর্তী বলেন, ‘একটা মানুষ খুন করা চাট্টিখানি কথা নয়। এর পেছনে কোনো বড় শক্তি আছে অলক্ষ্যে, আড়ালে। হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত আছে।’
তদন্ত নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘লোকজন তো বলছে—বিদ্যুৎ আগে বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা তো তদন্ত করার কেউ না। প্রশাসন যদি ব্যর্থ হয়ে যায় তো করার কী আছে?’
তবে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির প্রতি সন্দেহ আছে কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না সেটা আমার নাই। কারণ আমি তো কাউকে চিনি না। আমি তো দূরে থাকি। সংঘর্ষ বা কোনো ক্যাচালের কথাও শুনিনি। খুব ভালো মানুষ ছিল।’
গত শনিবার রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার বাসা থেকে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫২), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী (১২)-এর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পরদিন রবিবার ভোরে ওই এলাকার কানুদাসের ছেলে ও সিটি বাজারের মাছের দোকানের কর্মচারী মুগ্ধ দাস (২৩) এবং বিনয় চন্দ্র দাসের ছেলে ও স্বর্ণের দোকানের কারিগর সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) গ্রেপ্তার করা হয়। ওই দিন বিকেলে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন।
সেদিন এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ জানিয়েছিলেন, গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে মাদক সেবন করছিলেন মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস। এতে বাধা দেওয়ায় প্রথমে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীকে গামছা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে একে একে পরিবারের অন্য তিন সদস্যকেও হত্যা করা হয়।
তবে পুলিশের ওই প্রাথমিক বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং নিহতের স্বজনসহ বিভিন্ন মহল থেকে নিরপেক্ষ ও অধিকতর তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানান, অধিকতর স্বচ্ছ তদন্ত ও দ্রুত চার্জশিট দেওয়ার জন্য মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে।
তিনি জানান, রবিবার গভীর রাত পর্যন্ত গ্রেপ্তার দুই আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। সোমবার বিকেলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জী ডিবি কার্যালয়ে গিয়ে মামলার প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও নথিপত্র নতুন তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের ওসি জিন্নাত আলীর কাছে হস্তান্তর করেন।
হত্যাকাণ্ডের পর নিহতদের ব্যবহৃত চারটি মোবাইল ফোনের মধ্যে দুটি পুলিশ জব্দ করতে পারলেও বাকি দুটি ফোন কোথায়, কার কাছে কিংবা কী অবস্থায় রয়েছে—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনাটি তদন্তে মোবাইল ফোন, কল রেকর্ড, অবস্থান শনাক্তকরণসহ ডিজিটাল আলামত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
চারজনের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. বাবুল কুমার বিশ্বাস সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, নিহত গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী ও মেয়েকে ধর্ষণের চেষ্টার কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তে পাওয়া আলামতেও ধর্ষণের কোনো চিহ্ন মেলেনি বলে জানান তিনি।
মঙ্গলবার দুপুরে রংপুর জিলা স্কুল প্রাঙ্গণে নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর স্মরণে স্মরণসভা ও প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। প্রিয়ম চক্রবর্তী এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।
স্মরণসভায় হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
রংপুর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, গণপতি চক্রবর্তী শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবার কাছেই অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ছিলেন। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
এদিকে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) ডিআইজি মু. মাহবুবুর রশীদ।
মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব তৌছিফ আহমেদ স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ রদবদল করা হয়।