বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে
বিশ্বের তিন প্রধান শক্তি যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও শক্তির ভারসাম্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের অল্প সময়ের মধ্যেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বেইজিং সফর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাড়তি গুরুত্ব তৈরি করেছে। ধারাবাহিক এই উচ্চপর্যায়ের সফরগুলোকে ঘিরে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দেখছেন বিশ্লেষকরা।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পুতিনের এই সফর আনুষ্ঠানিক হলেও এর আড়ালে রয়েছে গভীর ভূরাজনৈতিক বার্তা। চীন-রাশিয়ার ২০০১ সালের বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এই সফর হলেও বাস্তব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জ্বালানি, নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞা এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য।
পুতিনের সফরের সময়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে রাশিয়ার অর্থনীতি চীনের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে চীনও রাশিয়ার জ্বালানি ও কৌশলগত সম্পদের অন্যতম প্রধান ক্রেতায় পরিণত হয়েছে।
শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে “পাওয়ার অব সাইবেরিয়া–২” গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প, যা বাস্তবায়িত হলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রুশ গ্যাস চীনে সরবরাহ সম্ভব হবে। পাশাপাশি সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন সরবরাহ ও নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলার যৌথ কৌশলও আলোচনায় আসতে পারে।
লন্ডনের কিংস কলেজের গবেষক মারিনা মিরনের মতে, এই সফরে নাটকীয় কোনো পরিবর্তন না ঘটলেও রাশিয়া ও চীনের কৌশলগত সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে। তার মতে, দুই দেশ এখন অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ইস্যুতে একে অপরের ওপর আগের চেয়ে বেশি নির্ভরশীল।
চ্যাথাম হাউজের বিশ্লেষক টিমোথি অ্যাশ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাশিয়া অনেকটাই চীনের ওপর নির্ভরশীল অবস্থানে রয়েছে। তার ভাষায়, “কূটনৈতিক ভারসাম্যের কেন্দ্র এখন বেইজিংয়ে।”
অন্যদিকে ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক ওলেগ ইগ্নাতভ বলেন, এই সম্পর্ককে শুধুমাত্র অধীনতা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং রাশিয়া ও চীন উভয়েই একটি বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা গঠনের চেষ্টা করছে, যেখানে কোনো একক শক্তির আধিপত্য থাকবে না।
সব মিলিয়ে পুতিনের বেইজিং সফরকে কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়, বরং বর্তমান বৈশ্বিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।