কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে চলতি বছরের উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা পদক নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কাজ না জানা অফিস সহকারী হাফিজ আহমাদকে শ্রেষ্ঠ কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের পাঠদান ফাঁকি দিয়ে কর্মঘন্টাকালীন উপজেলা শিক্ষা অফিসে সময় দেয়া সাইফুল ইসলাম প্রকাশ আলম এর প্রতিষ্ঠান আমানগন্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে উপজেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। মূলতঃ হাফিজ ও সাইফুল সিন্ডিকেটের পরামর্শে এবারের শিক্ষা পদকে কয়েকজনকে মনোনীত করা হয়েছে অভিযোগ উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষকের। এরমধ্যে শ্রেষ্ঠ কাব শিক্ষিকা মনোনীত হয়েছেন অভিযুক্ত সাইফুল ইসলামের বোন মোসা. কামরুন্নাহার। শনিবার (২৩ মে) বিকেলে শিক্ষা পদক হস্তান্তর করার সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে উপজেলা শিক্ষা অফিস।
জানা গেছে, গত ১৭ মে (রোববার) সদ্য বিদায়ী চৌদ্দগ্রাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. নূরুল আমিন ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান স্বাক্ষরিত প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬ এর একটি তালিকা ২১ মে বৃহস্পতিবার থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। একই সাথে মনোনীত শিক্ষক-শিক্ষিকা ও কর্মচারীদের অভিনন্দন জানিয়ে ফেসবুক পোস্টের ছড়াছড়িও লক্ষ্য করা গেছে। উল্লেখিত তালিকায় মনোনীতরা হলেন: শ্রেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক কাজী জহিরুল ইসলাম, শ্রেষ্ঠ সহকারী শিক্ষিকা সাজেদা সুলতানা লিখা, শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীন, শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষিকা লাকী আক্তার, শ্রেষ্ঠ কাব শিক্ষক মাহমুদুর রহমান, শ্রেষ্ঠ কাব শিক্ষিকা মোসা. কামরুন্নাহার, শ্রেষ্ঠ কর্মচারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী হাফিজ আহমাদ, শ্রেষ্ঠ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আমানগন্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
এরমধ্যে পদকের জন্য মনোনীত অফিস সহকারী হাফিজ আহমাদ অফিসিয়াল কাজ সঠিকভাবে না জানলেও উৎকোচ গ্রহণের বেলায় বেশ পারদর্শী বলে জানা গেছে। তার হয়রানীর শিকার হয়েছে উপজেলার অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকা। বিশেষ করে শিক্ষিকাদের মাতৃকালিন ছুটি, শিক্ষকদের বদলি বাণিজ্য, সার্ভিস বুকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে হয়রানী থেমে নেই। বছরের শুরুতে বই বিতরণ কার্যক্রম, মাঝামাঝি সময়ে বইয়ের চাহিদা সংশ্লিষ্ট কাজ সহ অফিসিয়াল বিভিন্ন কাজে ঘুষ বানিজ্য যেন তার নৈমত্তিক কাজ। এর আগের অফিস সহকারী মিজানুর রহমানকে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বদলি করিয়ে ‘মধু’ খেতে স্বল্প সময়ের মধ্যে লাকসাম অফিস থেকে পুনরায় চৌদ্দগ্রাম এসেছে এই হাফিজ আহমাদ। এরআগে ডেপুটেশনে চৌদ্দগ্রামে কর্মরত ছিল সে। গণঅভ্যূত্থানের আগে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এসব অপকর্ম করলেও ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করেনি। সম্প্রতি এক শিক্ষিকার পক্ষে সরকারি কোষাগারে টাকা জমা দেওয়ার ঘটনায় তাঁর দুর্নীতির বিষয়টি অনেকেই জানে। বর্তমান সময়ে দুর্নীতি চলমান থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষকরা।
এছাড়াও আমানগন্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম প্রকাশ আলম প্রায় প্রতিদিনই হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেই শিক্ষার্থীদের পাঠদান ফাঁকি দিয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে চলে যান। আবার কিছু কিছু সময় হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর না করেই উপজেলায় যান এবং পরদিন হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে শিক্ষা কর্মকর্তার সরকারি আইডি ব্যবহার করে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উপকারের নামে বিভিন্ন সরকারি কাজে মোটা অঙ্কের বাণিজ্য করছে বলে অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আমানগন্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা পাঠদান ফাঁকির বিষয়ে বিভিন্ন সময় তাঁকে প্রশ্ন করলে তিনি কোন জবাব দেন না। বিদ্যালয়ের সামনে থাকা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত ব্যবসায়ীসহ সবাই সাইফুল ইসলামের পাঠদান ফাঁকির বিষয়ে অবগত রয়েছেন। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো; প্রাথমিকের অনেক সহকারী শিক্ষক, উপজেলায় যাতায়াত করা বেশির ভাগ মানুষ ও অধিকাংশ সংবাদকর্মী মনে করতেন সাইফুল ইসলাম প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কোনো পদে নিযুক্ত কর্মকর্তা! সম্প্রতি প্রাথমিক শিক্ষকদের হয়রানী সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধেও হয়রানীর অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অবগত রয়েছেন। অপরদিকে শ্রেষ্ঠ কাব শিক্ষিকা হিসেবে মনোনীত মোসা. কামরুন্নাহার ওরফে মুক্তা প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলামের আপন বড় বোন। কিন্তু তিনি ঠিকানা দেখিয়েছেন স্বামীর বাড়ি চাঁদপুর হাজীগঞ্জের।
গত ১৯ মে মঙ্গলবার সকালে এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, হাফিজ আহমাদ ঠিকমত কাজ জানে না। সে একা কাজ করলে শিক্ষকদের বেতন পেতেও কষ্ট হবে। এজন্য সাইফুল ইসলাম কাজে সহযোগিতা করছে। শিক্ষা কর্মকর্তার সরকারি আইডি কি একজন শিক্ষক ব্যবহার করতে পারেন? এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ‘আগে ব্যবহার করতো, এখন করে না’।
অভিযোগ উঠেছে, হাফিজ আহমাদ ও সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জিম্মী করে মেডিকেল ছুটি, বকেয়া বিল, সার্ভিস বুক সংক্রান্ত নানা বিষয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করছে। তাদের কাছে জিম্মী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাও।
আমানগন্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর একজন অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম ওরফে আলম পাঠদান ফাঁকি দেওয়ার বিষয়ে বেশ কয়েকবার সতর্ক করা হয়েছে এবং শিক্ষা অফিসকেও অবহিত করা হয়েছে বিষয়টি। এ বিষয়ে কেউ কর্ণপাত করেনি। এক কথায়, সে নিজ ইচ্ছামতো বিদ্যালয়ে আসে এবং যায়। অন্য শিক্ষকদেরও সে আতঙ্কে রাখে, এজন্য শিক্ষকরা তার বিরুদ্ধে কিছু বলতে সাহস পায় না। আমরা চাই, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সাইফুল ইসলামকে আমাদের বিদ্যালয় থেকে বদলি করে অন্য কোথাও নিয়ে যাক। কারণ, তাঁর থেকে শিক্ষার্থীরা কিছুই পাচ্ছে না। শুধু কাগজে-কলমে উপজেলায় শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান না বানিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা করিয়ে শ্রেষ্ঠ হিসেবে গড়ে তুলুক। এটাই আমাদের চাওয়া।
অফিস সহকারী হাফিজ আহমাদের বক্তব্য জানতে তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার কল করলেও তিনি কলটি রিসিভ করেননি।
উপজেলা শিক্ষা অফিসে সময় দেয়া প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম ওরফে আলম বলেন, আমি শিক্ষা কমিটির কিছু নই। কর্তৃপক্ষ যাকে উপযুক্ত মনে করেছে, তাকে পদক দেয়ার জন্য মনোনীত করেছে। উপজেলা শিক্ষা অফিসে সময় দেয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, আমার বস আমাকে যেখানে দায়িত্ব পালন করতে বলবেন, সেখানেই আমি দায়িত্ব পালন করি।
শিক্ষা পদকের বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামানের মুঠোফোনে কল করলে তিনি একটি কর্মশালায় রয়েছেন বলে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
চৌদ্দগ্রাম উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সেক্রেটারি কাজী মো. কবির হোসেন বলেন, সারাদেশের শিক্ষা অফিসগুলোতে কর্মচারী সঙ্কট। ফলে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের হয়রানী রোধে অভিজ্ঞ শিক্ষকরা সহযোগিতা করেন।
চৌদ্দগ্রাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহাদাৎ হোসেন এ বিষয়ে বলেন, ‘এখানে জয়েন্ট কয়েছি মাত্র তিনদিন হলো। প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার আমাকে শিক্ষা পদকের বিষয়টি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে পরে জানাবো’।