জিএম. ফারুক হোসেন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, জাতীয় দৈনিক একুশে সংবাদ
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই দেশের মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেড়ে যায়। মানুষ চায় একটি কার্যকর, গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক সরকার। চায় অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াক, কর্মসংস্থান বাড়ুক, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আসুক, বিনিয়োগ বাড়ুক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসুক এবং প্রশাসন আরও জনবান্ধব হোক।
এসব প্রত্যাশা পূরণের ক্ষেত্রে মন্ত্রিসভার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মন্ত্রীই একটি মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেন, নীতি নির্ধারণ করেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই মন্ত্রণালয়ের কাজের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহি করেন।
সম্প্রতি মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দায়িত্ব বণ্টনের তালিকা দেখে একজন সাংবাদিক হিসেবে নয়, একজন নাগরিক হিসেবেও আমার মনে কয়েকটি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
আমার প্রশ্ন কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে নয়; আমার প্রশ্ন দায়িত্ব বণ্টনের কাঠামো নিয়ে।
দায়িত্ব বণ্টনের দিকে তাকালে দেখা যায়, কোনো কোনো মন্ত্রীর হাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় বা বিভাগ রয়েছে। আবার কোনো কোনো মন্ত্রণালয়ে পূর্ণ মন্ত্রীর পাশাপাশি প্রতিমন্ত্রীও রয়েছেন।
এখানেই আমার প্রথম প্রশ্ন—
একজন মন্ত্রী যদি একই সঙ্গে দুই বা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় পরিচালনা করতে পারেন, তাহলে একই সরকারের এতজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর প্রয়োজন কীভাবে নির্ধারণ করা হলো?
অন্যদিকে, যদি একটি মন্ত্রণালয়ের কাজ এতটাই ব্যাপক হয় যে সেখানে একজন পূর্ণ মন্ত্রীর পাশাপাশি একজন প্রতিমন্ত্রী প্রয়োজন, তাহলে একজন ব্যক্তির হাতে দুই-তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টিও কি নতুন করে বিবেচনা করা উচিত নয়?
আমি মনে করি, এই প্রশ্নের উত্তর সরকারের জন্য অস্বস্তিকর হওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং একটি গণতান্ত্রিক সরকারকে এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর জনগণের সামনে দেওয়া উচিত।
কারণ স্বচ্ছতা সরকারের দুর্বলতা নয়; স্বচ্ছতাই সরকারের শক্তি।
এখানে আমি একটি বিষয় পরিষ্কার করতে চাই।
আমি মনে করি না যে একজন মন্ত্রীর হাতে একাধিক মন্ত্রণালয় থাকলেই সেটি ভুল সিদ্ধান্ত।
কিছু মন্ত্রণালয় পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। সেগুলোকে একই রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনে রাখলে নীতিগত সমন্বয় সহজ হতে পারে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত হতে পারে এবং সরকারের সামগ্রিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও সুবিধা হতে পারে।
কিন্তু এর পাশাপাশি একটি বাস্তব প্রশ্ন থেকেই যায়—
একজন মানুষ কি একই সঙ্গে দুই-তিনটি বড় মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি বিষয়কে প্রয়োজনীয় সময় ও মনোযোগ দিতে পারবেন?
একটি মন্ত্রণালয়ের অধীনেই থাকে অসংখ্য দপ্তর, অধিদপ্তর, সংস্থা ও প্রকল্প। থাকে বিশাল বাজেট, হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রতিদিনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, সংসদীয় কার্যক্রম, মাঠপর্যায়ের সমস্যা এবং জনগণের অসংখ্য অভিযোগ।
তাই একজন মন্ত্রীর হাতে যখন একাধিক মন্ত্রণালয় দেওয়া হয়, তখন তাঁর সক্ষমতার পাশাপাশি সময় ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
একই মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী থাকা নিয়েও আমার একটি প্রশ্ন রয়েছে।
আমি মনে করি, বড় কোনো মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দুজন থাকা কার্যকর হতে পারে—যদি তাঁদের দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে ভাগ করা থাকে।
মন্ত্রী হয়তো সামগ্রিক নীতি ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নেবেন।
প্রতিমন্ত্রী হয়তো নির্দিষ্ট খাত, প্রকল্প বা মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম দেখবেন।
এভাবে দায়িত্ব ভাগ হলে একটি মন্ত্রণালয়ের কাজ আরও গতিশীল হতে পারে।
কিন্তু যদি দায়িত্বের সীমা স্পষ্ট না থাকে, তাহলে একই বিষয়ে দুই ধরনের নির্দেশনা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তাই আমার মতে, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বের লিখিত বিভাজন জনগণের সামনে প্রকাশ করা উচিত।
এতে শুধু জনগণ নয়, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও পরিষ্কারভাবে জানতে পারবেন—কোন বিষয়ে কার কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
আমার কাছে বিষয়টির আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি বড় রাজনৈতিক দলে অনেক অভিজ্ঞ ও যোগ্য নেতা থাকেন। সবাই মন্ত্রী হবেন—এমন কোনো নিয়ম নেই, সেটি সম্ভবও নয়।
কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো—
যাঁরা মন্ত্রী হলেন না, তাঁদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা কি রাষ্ট্রের প্রয়োজনে অন্য কোনোভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে?
আমাদের দেশে দক্ষ মানুষের অভাব নেই।
কেউ অর্থনীতিতে দক্ষ, কেউ কৃষিতে, কেউ শিল্প-বাণিজ্যে, কেউ শিক্ষা-স্বাস্থ্যে, কেউ প্রশাসনে, কেউ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে অভিজ্ঞ।
আমি মনে করি, রাষ্ট্রের প্রয়োজনে এসব মানুষকে বিভিন্ন বিশেষ কমিটি, টাস্কফোর্স, সংস্কার কার্যক্রম, জাতীয় প্রকল্প কিংবা বিশেষ দায়িত্বে কাজে লাগানো যেতে পারে।
কারণ—
যোগ্য মানুষ কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পদ নন; তাঁরা রাষ্ট্রের সম্পদ।
আমার এই বক্তব্যকে কেউ যেন মন্ত্রিসভা ছোট করার দাবি হিসেবে না দেখেন।
আমি তা বলছি না।
মন্ত্রী কম হলেই সরকার ভালো চলবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
আবার মন্ত্রী বেশি হলেই সরকার খারাপ—এমন কথাও বলা যায় না।
আমার বক্তব্য হলো—
প্রতিটি পদ এবং প্রতিটি দায়িত্বের একটি সুস্পষ্ট প্রশাসনিক ও জনস্বার্থভিত্তিক যুক্তি থাকা প্রয়োজন।
একজন মন্ত্রীর হাতে তিনটি মন্ত্রণালয় থাকলে সরকারকে বলতে হবে—কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
একটি মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দুজন থাকলে বলতে হবে—দুজনের দায়িত্ব কীভাবে ভাগ করা হয়েছে।
আর একজন যোগ্য ব্যক্তি মন্ত্রিসভার বাইরে থাকলে তাঁর দক্ষতা কোথায় কাজে লাগানো হচ্ছে—সেটিও ভাবা প্রয়োজন।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নতুন পদ্ধতি চালু করা দরকার।
মন্ত্রী হওয়ার পর শুধু দায়িত্ব গ্রহণ নয়—কর্মপরিকল্পনাও জনগণের সামনে প্রকাশ করা উচিত।
একজন মন্ত্রী বলতে পারেন—
প্রথম ১০০ দিনে আমি কী করব।
প্রথম ছয় মাসে কী করব।
এক বছরে কী অর্জন করতে চাই।
এরপর বছর শেষে জনগণই বিচার করবে—তিনি কতটা করতে পেরেছেন।
এতে মন্ত্রীর ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি হবে, কিন্তু সেই চাপ হবে ইতিবাচক—কাজ করার চাপ।
আমি মনে করি, এখানেই মূল বিষয়টি।
কেউ যদি একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন, তাঁর কাছে একটি মন্ত্রণালয়ের ফলাফল চাইতে হবে।
দুইটি নিলে দুইটির।
তিনটি নিলে তিনটির।
একজন মন্ত্রী যদি তিনটি মন্ত্রণালয় সফলভাবে পরিচালনা করতে পারেন, তাহলে সেটি তাঁর দক্ষতার প্রমাণ এবং সরকারের সিদ্ধান্তের সাফল্য।
কিন্তু তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে যদি কোনো একটির কাজও কাঙ্ক্ষিত গতিতে না চলে, তাহলে দায়িত্ব বণ্টনের কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তোলাও স্বাভাবিক।
আমরা অনেক সময় আলোচনা করি—কে মন্ত্রী হলেন, কে প্রতিমন্ত্রী হলেন, কে কোন মন্ত্রণালয় পেলেন।
কিন্তু আমার মনে হয়, আমাদের আলোচনার কেন্দ্র হওয়া উচিত অন্য জায়গায়।
কে কী কাজ করলেন?
কত দিনে করলেন?
কত টাকা খরচ হলো?
জনগণ কী পেল?
এই চারটি প্রশ্নের উত্তরই একজন মন্ত্রীর প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া উচিত।
একজন মন্ত্রী একটি মন্ত্রণালয় নিয়ে যদি মানুষের জীবন বদলে দিতে পারেন, তিনি সফল।
অন্যদিকে কেউ তিনটি মন্ত্রণালয় নিয়েও যদি জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারেন, তাহলে শুধু বড় দায়িত্ব পাওয়াকে সফলতা বলা যাবে না।
আমি মনে করি, সরকার চাইলে মন্ত্রিসভার দায়িত্ব বণ্টনকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে পারে।
প্রথমত, একাধিক মন্ত্রণালয় একজন মন্ত্রীর হাতে দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তি স্পষ্ট করা।
দ্বিতীয়ত, একই মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী থাকলে তাঁদের দায়িত্ব লিখিতভাবে ভাগ করা।
তৃতীয়ত, প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করা।
চতুর্থত, মন্ত্রীদের কর্মদক্ষতা পরিমাপের জন্য নির্দিষ্ট সূচক নির্ধারণ করা।
পঞ্চমত, নির্দিষ্ট সময় পর মন্ত্রণালয়ভিত্তিক অর্জনের হিসাব জনগণের সামনে প্রকাশ করা।
ষষ্ঠত, মন্ত্রিসভার বাইরে থাকা যোগ্য ব্যক্তিদেরও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজে সম্পৃক্ত করা।
আমি বিশ্বাস করি, এতে সরকার দুর্বল হবে না; বরং সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়বে।
আমি এই কথাগুলো লিখছি কোনো রাজনৈতিক পক্ষকে খুশি বা অসন্তুষ্ট করার জন্য নয়।
আমি লিখছি একজন সাংবাদিক হিসেবে, একজন নাগরিক হিসেবে এবং একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে আমার দায়িত্ববোধ থেকে।
সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করা যেমন গণমাধ্যমের দায়িত্ব, তেমনি প্রয়োজনীয় প্রশ্ন তোলাও গণমাধ্যমের দায়িত্ব।
আমার কাছে মন্ত্রী কতজন—সেটি বড় বিষয় নয়।
আমার কাছে বড় বিষয় হলো—
সঠিক মানুষ কি সঠিক জায়গায় আছেন?
প্রতিটি মন্ত্রী কি তাঁর দায়িত্ব পালনের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছেন?
একজনের হাতে একাধিক মন্ত্রণালয় দেওয়ার ফলে কি প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ছে?
মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব কি পরিষ্কার?
রাষ্ট্রের সব যোগ্য মানুষকে কি আমরা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছি?
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
জনগণ যে আশা নিয়ে এই সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছে, সেই আশার কতটুকু বাস্তবে পূরণ হচ্ছে?
আমি মনে করি, আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হওয়া উচিত—
একজন মন্ত্রী হোন, দুইজন হোন কিংবা তিনজন—শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছে তাঁদের প্রত্যেককে কাজের হিসাব দিতেই হবে।
আর সেই হিসাব চাওয়ার অধিকার জনগণের যেমন আছে, সেই প্রশ্নটি তুলে ধরার দায়িত্ব গণমাধ্যমেরও আছে।
জিএম. ফারুক হোসেন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
জাতীয় দৈনিক একুশে সংবাদ