• শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:১৯ পূর্বাহ্ন
Headline
‘জোড়াতালির’ বিপিএল আর নয়, প্রয়োজনে এবার টুর্নামেন্টই হবে না: তামিম কলকাতার আগুনে নিহত ৭ বাংলাদেশির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন, মরদেহ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে লড়বে বিএনপি, শৃঙ্খলা ভাঙলে কঠোর ব্যবস্থা রাষ্ট্রপতির শপথ: বঙ্গভবন ঘিরে ডিএমপির বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শেষে বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সামুদ্রিক নিরাপত্তায় সহযোগিতা জোরদারে সম্মত ভারত-জাপান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হলেন রুহুল কবির রিজভী মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় যুক্তরাজ্যের অভিনন্দন মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় ডা. শফিকুর রহমানের অভিনন্দন মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত, লাল গোলাপ দিয়ে শুভেচ্ছা জানালেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

ক্ষমতার শীর্ষে উত্তরবঙ্গ, অর্থনৈতিক উন্নয়নে কেন পিছিয়ে?

জি. এম.ফারুক হোসেন / ১১ Time View
Update : শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
ছবি : কোলাজ

মতামত | জি.এম. ফারুক হোসেন

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তরবঙ্গের অবদান কোনোভাবেই অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দেশের বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক আন্দোলন, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও রাষ্ট্র পরিচালনায় উত্তরাঞ্চল থেকে উঠে এসেছেন বহু গুরুত্বপূর্ণ নেতা। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব—বিভিন্ন সময়ে উত্তরবঙ্গের মানুষের উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান।

আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতাও তার একটি বড় উদাহরণ।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বগুড়ার রাজনৈতিক ও পারিবারিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁওয়ের সন্তান। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর শিকড়ও কুড়িগ্রামে। অর্থাৎ বর্তমান রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ স্তরে উত্তরাঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব স্পষ্ট।

এটি নিঃসন্দেহে উত্তরবঙ্গের মানুষের জন্য গর্বের বিষয়।

কিন্তু এই গর্বের পাশাপাশি আমার মনে একটি প্রশ্নও জাগে—রাজনীতিতে উত্তরবঙ্গের এত শক্তিশালী অবস্থান থাকার পরও অর্থনীতিতে এই অঞ্চল কেন এখনও পিছিয়ে?

এই প্রশ্নটি নতুন নয়। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকারের আমলেই উত্তরবঙ্গের মানুষ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। মন্ত্রী হয়েছেন, রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন, প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে গেছেন। কিন্তু সেই তুলনায় উত্তরবঙ্গে বড় শিল্পায়ন, ব্যাপক বেসরকারি বিনিয়োগ ও টেকসই কর্মসংস্থান কেন তৈরি হলো না—তার উত্তর আমাদের খুঁজতে হবে।

আমার দৃষ্টিতে, উত্তরবঙ্গের সমস্যাটি মূলত রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভাব নয়; বরং অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ঘাটতি।

ক্ষমতা আছে, কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নেই

উত্তরবঙ্গ কৃষিতে সমৃদ্ধ। ধান, আলু, ভুট্টা, গম, আম, লিচু, সবজি, মাছ, দুধ ও প্রাণিসম্পদ—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই অঞ্চল বাংলাদেশের খাদ্য অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই উৎপাদন থেকে উত্তরবঙ্গের মানুষ কতটা মূল্য সংযোজন করতে পারছে?

কৃষক আলু উৎপাদন করছেন, কিন্তু আলু থেকে বড় পরিসরে চিপস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, স্টার্চসহ মূল্য সংযোজিত পণ্য তৈরির শিল্প কতটা হয়েছে?

কৃষক আম উৎপাদন করছেন, কিন্তু আমের পাল্প, জুস, জ্যাম, ড্রাই ফ্রুট ও রপ্তানিমুখী খাদ্যশিল্প কতটা গড়ে উঠেছে?

ভুট্টা উৎপাদন হচ্ছে, কিন্তু সেই ভুট্টাকে কেন্দ্র করে ফিড, খাদ্যপ্রক্রিয়াজাতকরণ ও অন্যান্য শিল্পের বিশাল সম্ভাবনা কতটা কাজে লাগানো হয়েছে?

অর্থাৎ আমরা উৎপাদন করছি, কিন্তু উৎপাদনের পরবর্তী অর্থনৈতিক ধাপগুলো নিজেদের অঞ্চলে তৈরি করতে পারছি না।

এ কারণেই উত্তরবঙ্গের কৃষি অর্থনীতি এখনও অনেকাংশে কাঁচামাল উৎপাদনের অর্থনীতিতে আটকে আছে।

কেন ঢাকামুখী হতে হবে উত্তরবঙ্গের তরুণদের?

উত্তরবঙ্গের একজন মেধাবী তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে কেন ঢাকায় চাকরি খুঁজবেন?

কেন বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, নীলফামারী কিংবা ঠাকুরগাঁওয়ে তাঁর জন্য পর্যাপ্ত শিল্প, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, করপোরেট অফিস কিংবা উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ থাকবে না?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু উত্তরবঙ্গের জন্য নয়—পুরো বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা যদি সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ঢাকাকেন্দ্রিক রাখি, তাহলে ঢাকার ওপর চাপ বাড়তেই থাকবে। যানজট, আবাসন সংকট, দূষণ ও নাগরিক সেবার ওপর চাপও বাড়বে।

অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যদি শক্তিশালী অর্থনৈতিক কেন্দ্র তৈরি করা যায়, তাহলে মানুষ নিজের অঞ্চলেই কর্মসংস্থান পাবে।

উত্তরবঙ্গকে ‘কৃষি অঞ্চল’ নয়, ‘কৃষিভিত্তিক শিল্পাঞ্চল’ করতে হবে

আমার মতে, উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।

উত্তরবঙ্গকে শুধু কৃষি উৎপাদনের অঞ্চল হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে কৃষিভিত্তিক শিল্প ও রপ্তানির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

কৃষি হবে কাঁচামালের উৎস।

শিল্প হবে মূল্য সংযোজনের মাধ্যম।

রপ্তানি হবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ।

আর এর মাধ্যমে তৈরি হবে কর্মসংস্থান।

অর্থাৎ উন্নয়নের সূত্রটি হতে পারে—

কৃষি → প্রক্রিয়াজাতকরণ → শিল্প → কর্মসংস্থান → রপ্তানি → অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন।

এই একটি কাঠামো বাস্তবায়ন করতে পারলে উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক চিত্র কয়েক বছরের মধ্যেই বদলে দেওয়া সম্ভব।

এবার কি রাজনৈতিক নেতৃত্ব উত্তরবঙ্গের জন্য অর্থনৈতিক অঙ্গীকার করবে?

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা উত্তরবঙ্গের সামনে একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার পরিচালিত হচ্ছে। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর উত্তরবঙ্গের মানুষ। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও উত্তরাঞ্চলের সন্তান।

আমি মনে করি, এই পরিস্থিতিকে কোনোভাবেই আঞ্চলিক সুবিধা আদায়ের রাজনীতি হিসেবে দেখা উচিত নয়।

বরং এটিকে দেখা উচিত জাতীয় অর্থনীতিতে ভারসাম্য আনার ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে।

উত্তরবঙ্গকে যদি পরিকল্পিতভাবে শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, রপ্তানি ও প্রযুক্তির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে এর সুফল শুধু উত্তরাঞ্চল নয়—পুরো বাংলাদেশ পাবে।

আমার কয়েকটি প্রস্তাব

আমার মতে, উত্তরবঙ্গের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ‘উত্তরাঞ্চল অর্থনৈতিক উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা’ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

এর আওতায় থাকতে পারে—

প্রথমত, উত্তরাঞ্চলে বিশেষ কৃষিভিত্তিক শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা।

দ্বিতীয়ত, আলু, ভুট্টা, আম, লিচু, সবজি, দুধ, মাছ ও মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য বড় শিল্প স্থাপনে বিশেষ বিনিয়োগ সুবিধা দেওয়া।

তৃতীয়ত, আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ ও কোল্ড চেইন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।

চতুর্থত, উত্তরাঞ্চলের তরুণদের শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা।

পঞ্চমত, বগুড়া, রংপুর ও রাজশাহীকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলা।

ষষ্ঠত, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোকে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য ও রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।

সপ্তমত, উত্তরবঙ্গে শিল্প স্থাপনে উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ, বিদ্যুৎ, জমি, অবকাঠামো ও কর সুবিধা নিশ্চিত করা।

শুধু প্রকল্প নয়, ফলাফল দেখতে চাই

আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনায় সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—আমরা অনেক সময় প্রকল্পের সংখ্যা দিয়ে উন্নয়ন পরিমাপ করি।

আমি মনে করি, এখন থেকে উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন পরিমাপ করতে হবে অন্যভাবে।

আমরা জানতে চাই—

কতটি নতুন শিল্প হয়েছে?

কত টাকা বিনিয়োগ এসেছে?

কত মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে?

কৃষকের আয় কত বেড়েছে?

কতটি পণ্য উত্তরবঙ্গ থেকে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে?

কত তরুণকে আর ঢাকায় চাকরি খুঁজতে হচ্ছে না?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই হবে উন্নয়নের প্রকৃত মাপকাঠি।

উত্তরবঙ্গের মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়

উত্তরবঙ্গের মানুষ দেশের অন্য অঞ্চলের চেয়ে বেশি কিছু চায় না। তারা শুধু চায় সমান সুযোগ

তারা চায় তাদের সন্তান নিজ এলাকায় ভালো শিক্ষা পাবে, চাকরি পাবে, ব্যবসা করবে।

তারা চায় কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাবে।

তারা চায় উদ্যোক্তা শিল্প স্থাপনের সুযোগ পাবে।

তারা চায় উত্তরবঙ্গ থেকে তরুণদের ঢাকামুখী হওয়ার প্রবণতা কমবে।

সবচেয়ে বড় কথা, তারা চায়—উত্তরবঙ্গকে আর পিছিয়ে থাকা অঞ্চল হিসেবে নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হোক।

শেষ কথা

আমার কাছে উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন কোনো আঞ্চলিক দাবি নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্যের দাবি।

রাজনীতিতে উত্তরবঙ্গের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি। কিন্তু সেই গর্ব তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবনেও তার প্রতিফলন দেখা যাবে।

ক্ষমতার শীর্ষে উত্তরবঙ্গের মানুষের উপস্থিতি আমাদের গর্বিত করে। এখন প্রয়োজন সেই রাজনৈতিক শক্তিকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা।

আজকের বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের সামনে তাই উত্তরবঙ্গের মানুষের প্রত্যাশাও স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে।

আমার বিশ্বাস, এবার যদি উত্তরবঙ্গের জন্য একটি বাস্তবসম্মত, দীর্ঘমেয়াদি এবং শিল্পভিত্তিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা যায়, তাহলে আগামী এক দশকে এই অঞ্চল বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।

কারণ উত্তরবঙ্গের মানুষ আর শুধু এই প্রশ্ন করতে চায় না—

“ক্ষমতার শীর্ষে আমাদের মানুষ কতজন?”

তারা এখন জানতে চায়—

“সেই ক্ষমতার সুফলে উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবন কতটা বদলেছে?”

এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত।

জি.এম. ফারুক হোসেন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
জাতীয় দৈনিক একুশে সংবাদ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category