• বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০৩ অপরাহ্ন

২০৩৫ সালে কর-জিডিপি ১৫ শতাংশে নিতে এনবিআরের মহাপরিকল্পনা

স্টাফ রিপোর্টার / ২৩ Time View
Update : সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

‘ওয়ান এনবিআর’ কাঠামোয় আসছে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানের ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে বড় ধরনের সংস্কার ও সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ লক্ষ্যে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর পরিপালন জোরদার, প্রযুক্তি ও তথ্যের ব্যবহার বাড়ানো এবং আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে পরিচালনার জন্য ‘ওয়ান এনবিআর’ কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এনবিআরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পৃথক প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস বিভাগ সমন্বিতভাবে করদাতা ব্যবস্থাপনায় কাজ করবে। এর আওতায় করদাতার তথ্য, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, কর পরিশোধ, বকেয়া রাজস্ব ও কর পরিপালন-সংক্রান্ত তথ্য একীভূত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এনবিআরের সংস্কার ও সক্ষমতা বৃদ্ধির রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। সেখানে সরকারি ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এনবিআরের রূপরেখায় স্বল্পমেয়াদে কর-জিডিপি অনুপাত ৮ দশমিক ৮ শতাংশ এবং মধ্যমেয়াদে ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে ২০৩৫ সালের মধ্যে এ অনুপাত ১৫ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এনবিআর বলছে, শুধু করের হার বাড়িয়ে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। এজন্য করের আওতা উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি ও তথ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং করদাতাদের কর পরিপালন নিশ্চিত করতে হবে।

রাজস্ব প্রশাসনে বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন, তথ্য আদান-প্রদানের সক্ষমতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং করদাতা সেবা সম্প্রসারণকে রাজস্ব বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ বছরে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বেশির ভাগ সময় ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে ছিল। ২০১১-১২ থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের মধ্যে তা প্রায় ১০ শতাংশে উঠলেও পরবর্তী সময়ে আবার কমে যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ।

এনবিআরের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০০১-০২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত সরকারি ব্যয় ৪ দশমিক ৪৭ গুণ বাড়লেও এনবিআরের রাজস্ব আহরণ বেড়েছে ৩ দশমিক ৪০ গুণ। এ সময়ে রাজস্ব প্রবৃদ্ধির গড় হার ছিল ১৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোকে এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে এনবিআর।

প্রস্তাবিত সংস্কার কর্মপরিকল্পনায় প্রতিটি করদাতার জন্য স্বতন্ত্র মাস্টার ডেটাবেজ এবং অভিন্ন ডেটা ডিকশনারি ও সিস্টেম ইনভেন্টরি তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সমন্বিত এন্টারপ্রাইজ আর্কিটেকচার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রথম তিন বছরের মধ্যে একটি সমন্বিত করদাতা অ্যাকাউন্ট, গ্রাহক ও মামলা ব্যবস্থাপনার সমন্বিত ব্যবস্থা এবং তৃতীয় পক্ষের তথ্যের সঙ্গে করদাতার তথ্য মিলিয়ে দেখার ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

একই সঙ্গে বিভিন্ন করের ক্ষেত্রে পরিপালন ঝুঁকি শনাক্তের অভিন্ন ব্যবস্থা এবং কর পরিশোধ ও বকেয়া রাজস্বের সমন্বিত তথ্যভান্ডার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কাস্টমসের ক্ষেত্রেও আমদানি ও রপ্তানিকারকদের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে পণ্যের মূল্যায়ন, ভ্যাট ও আয়কর-সংক্রান্ত ঝুঁকির তথ্য সমন্বয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষায়িত সীমান্ত কার্যক্রম বহাল রেখেই এ সমন্বিত ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

পরবর্তী তিন থেকে পাঁচ বছরের কর্মপরিকল্পনায় প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে কর পরিপালন বিশ্লেষণের ব্যবস্থা চালু, আইনি সুযোগ থাকলে আগে থেকে পূরণ করা কর রিটার্নের পরিধি বাড়ানো এবং কম ঝুঁকির ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর নেটওয়ার্ক ও সম্ভাব্য জালিয়াতি শনাক্তে উন্নত তথ্য বিশ্লেষণ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।

রাজস্ব প্রশাসন শক্তিশালী করতে তাৎক্ষণিক পর্যায়ে করদাতা সেবা, সুশাসন, নীতি প্রণয়ন, তথ্য ব্যবস্থাপনা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এনবিআর জানিয়েছে, রাজস্ব নীতির মাধ্যমে শিল্পোন্নয়ন ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হবে। এর অংশ হিসেবে কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমানো, কৃষি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ভ্যাট অব্যাহতি এবং বিভিন্ন খাতে কম আয়কর হার ও কর অব্যাহতির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া কাস্টমস অটোমেশন ও সিঙ্গেল-উইন্ডো সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ রয়েছে। কৃষি, তৈরি পোশাক, রেফ্রিজারেটর ও এয়ার কন্ডিশনার, তথ্যপ্রযুক্তি, অটোমোবাইল ও বৈদ্যুতিক যানবাহন, মোবাইল ফোন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, পুঁজিবাজার, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ওষুধ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতকে নীতিগত সহায়তার আওতায় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

এনবিআরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে রাজস্ব প্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক ও পরিচালন সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ জোরদার করা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের চাহিদা পূরণে অভ্যন্তরীণ রাজস্বের সক্ষমতা বৃদ্ধি এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category