তবে সংশ্লিষ্টদের বড় একটি অংশের বক্তব্য স্পষ্ট—স্কুল বন্ধ করার প্রশ্নই আসে না; বরং প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে।
প্রশ্ন উঠছে, একজন সাধারণ দপ্তরি কিংবা অফিস সহকারী চাকরি করে কীভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হলেন? কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পদের সঙ্গে তার বৈধ আয় ও চাকরির বেতন-ভাতার সামঞ্জস্য আছে কি না—তা কি কখনো খতিয়ে দেখা হয়েছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে প্রয়োজন কেবল মুখের কথা নয়; প্রয়োজন সম্পদের হিসাব, আয়কর নথি, ব্যাংক লেনদেন, জমি-ফ্ল্যাটের দলিল, নিয়োগসংক্রান্ত নথি এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাবের স্বাধীন যাচাই।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কয়েকজনের সম্পদ ও জীবনযাত্রা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে সাবেক অধ্যক্ষ সেলিনা আক্তার, সাবেক সহকারী প্রধান শিক্ষক মশিউর রহমান, বর্তমান সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. মাসুম মিয়া, সিনিয়র সহকারী শিক্ষক চন্দা রানী দেবনাথ এবং অফিস সহকারী আশিষ দেবনাথকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগ ও প্রশ্ন সামনে এসেছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অভিযোগ ওঠা আর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। ফলে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
প্রশ্ন হলো, এতদিন এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসন বা ম্যানেজিং কমিটি কী পদক্ষেপ নিয়েছে?
একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ম্যানেজিং কমিটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ, আর্থিক লেনদেন, প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে যথাযথ নজরদারি ছিল কি না—এখন সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কোনো অনিয়ম যদি হয়ে থাকে, তা একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে নজরদারির ঘাটতি, দায়িত্বে অবহেলা কিংবা কোনো পর্যায়ে প্রশ্রয় থাকলে সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
দুর্নীতির অভিযোগ যেমন তদন্ত করতে হবে, তেমনি অভিযোগ জেনেও যারা ব্যবস্থা নেননি—তাদের ভূমিকারও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, এমন দাবি উঠেছে।
প্রতিষ্ঠান নিয়ে চলমান আলোচনায় একটি প্রশ্নও সামনে এসেছে—“ইসলাম গ্রুপ স্কুল বন্ধ করতে যাবে কেন?”
সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। বরং দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তা শনাক্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করাই কার্যকর পথ।
তাদের ভাষ্য, একটি প্রতিষ্ঠান দুর্নীতির কারণে ধ্বংসের দিকে গেলে সেটিকে বন্ধ করার প্রয়োজন হয় না; স্বচ্ছতা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হলেই প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে তার গ্রহণযোগ্যতা হারাবে।
আফতাব উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজকে ঘিরে ওঠা প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আবেগ নয়, প্রয়োজন নথি ও তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত।
কর্মরত ও সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বৈধ আয় ও সম্পদের সামঞ্জস্য, নিয়োগ প্রক্রিয়া, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন, বিভিন্ন খাতে ব্যয়, বেতন-ভাতা, উন্নয়ন প্রকল্প এবং ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্ত—সবকিছু পর্যায়ক্রমে যাচাই করা যেতে পারে।
অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি অভিযোগ মিথ্যা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও দায়মুক্তি দিতে হবে।
সবশেষে প্রশ্নটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা খোলা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো—আফতাব উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কি সত্যিই স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলকভাবে পরিচালিত হচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখন প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ, ম্যানেজিং কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদেরই দিতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে হেয় করা নয়; বরং অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে প্রকৃত সত্য সামনে আনতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন হলে সম্পদ ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের বৈধতা যাচাই, অনিয়ম প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে অনিয়ম ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
কারণ স্কুল বন্ধ করা সমাধান নয়—দুর্নীতির দরজা বন্ধ করাই এখন সবচেয়ে বড় দাবি।