নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা, আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করতে নতুন অর্থায়ন কর্মসূচি চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘উদ্যোগ: উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’ নামে এই কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত তরুণ উদ্যোক্তারা কোনো জামানত ছাড়াই সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন সুবিধা পাবেন।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্ট থেকে এ-সংক্রান্ত নীতিমালা জারি করা হয়। নীতিমালাটি দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও উপজেলাভিত্তিক সম্ভাবনাময় তরুণদের খুঁজে বের করে তাদের ব্যবসায়িক উদ্যোগ বাস্তবায়নে অর্থায়ন ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া।
নীতিমালা অনুযায়ী, কর্মসূচির আওতায় অর্থায়ন পেতে আবেদনকারীর বয়স আবেদনের শেষ তারিখে সর্বোচ্চ ২৮ বছর হতে হবে। তাকে বাংলাদেশের নাগরিক এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।
তবে ঋণখেলাপি ব্যক্তি, এর আগে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যবসায়িক ঋণ গ্রহণকারী এবং সরকারি, আধাসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরা এ সুবিধার আওতায় আসবেন না।
এই কর্মসূচির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো ‘ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স’ ব্যবস্থা। একজন উদ্যোক্তার ব্যবসার প্রকৃত প্রয়োজন ও সম্ভাব্য ব্যয় মূল্যায়ন করে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন দেওয়া হবে।
এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ম্যাচিং গ্র্যান্ট বা অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে।
অর্থাৎ কোনো উদ্যোক্তার ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণে ১২ লাখ টাকা প্রয়োজন হলে তিনি ৬ লাখ টাকা ঋণ এবং ৬ লাখ টাকা অনুদান হিসেবে পেতে পারেন। উভয় অর্থ একই সময়ে উদ্যোক্তার ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে।
তবে ঋণের অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে কিংবা অর্থের অপব্যবহার প্রমাণিত হলে অনুদানের অর্থও সুদমুক্ত ঋণে রূপান্তরিত হবে। পরবর্তী সময়ে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ওই অর্থ আদায় করা হবে।
কর্মসূচির আওতায় শুধু প্রচলিত ব্যবসা নয়, সম্ভাবনাময় বিভিন্ন নতুন ও বিদ্যমান বৈধ উদ্যোগকে অর্থায়নের জন্য বিবেচনা করা হবে।
এর মধ্যে রয়েছে কারিগরি উদ্যোগ, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন বৈধ ব্যবসায়িক উদ্যোগ।
বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় উৎপাদনমুখী উদ্যোগ, কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং স্থানীয় সম্পদনির্ভর ব্যবসার মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
যোগ্য উদ্যোক্তা বাছাইয়ের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখতে প্রতিটি উপজেলায় একটি করে লিড ব্যাংক নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
আগ্রহী তরুণরা যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখা থেকে আবেদন ফরম সংগ্রহ ও জমা দিতে পারবেন। পরে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের লিড ব্যাংকের মাধ্যমে আবেদনগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো হবে।
আবেদনকারীর ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, বাজার সম্ভাবনা, উদ্যোগের বাস্তবতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতা যাচাই করা হবে।
উদ্যোক্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, তফসিলি ব্যাংক, সফল উদ্যোক্তা, শিল্প খাতের প্রতিনিধি ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ প্যানেল কাজ করবে।
ব্যবসার সম্ভাবনা ও উদ্যোক্তার সক্ষমতা যাচাই শেষে যোগ্যদের চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হবে। মনোনীত উদ্যোক্তাদের ১৭ কার্যদিবসের মধ্যে ঋণ অনুমোদনের ব্যবস্থা করার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এ কর্মসূচিতে শুধু অর্থায়নের মধ্যেই সহায়তা সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো নির্বাচিত উদ্যোক্তাদের আর্থিক সাক্ষরতা প্রশিক্ষণ, ব্যবসায়িক মেন্টরিং এবং বাজারসংযোগে সহায়তা করবে।
এ ছাড়া ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ, ব্যবসা নিবন্ধনসহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতেও উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করার কথা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও উদ্যোক্তাদের মতে, সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই কর্মসূচি দেশের তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে পারে। বিশেষ করে যেসব তরুণের ব্যবসার ধারণা ও সক্ষমতা রয়েছে কিন্তু পর্যাপ্ত মূলধনের অভাবে উদ্যোগ শুরু করতে পারছেন না, তাদের জন্য জামানতবিহীন ঋণ ও অনুদানের এই সমন্বিত ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে কর্মসূচির সফলতা নির্ভর করবে উদ্যোক্তা নির্বাচন, অর্থ ছাড়, প্রকল্প তদারকি এবং অনুদানের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহারের ওপর। একই সঙ্গে প্রত্যন্ত এলাকার তরুণদের কাছে কর্মসূচির তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং ব্যাংকিং প্রক্রিয়া সহজ করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।