• শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:১৯ পূর্বাহ্ন
Headline
‘জোড়াতালির’ বিপিএল আর নয়, প্রয়োজনে এবার টুর্নামেন্টই হবে না: তামিম কলকাতার আগুনে নিহত ৭ বাংলাদেশির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন, মরদেহ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে লড়বে বিএনপি, শৃঙ্খলা ভাঙলে কঠোর ব্যবস্থা রাষ্ট্রপতির শপথ: বঙ্গভবন ঘিরে ডিএমপির বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শেষে বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সামুদ্রিক নিরাপত্তায় সহযোগিতা জোরদারে সম্মত ভারত-জাপান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হলেন রুহুল কবির রিজভী মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় যুক্তরাজ্যের অভিনন্দন মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় ডা. শফিকুর রহমানের অভিনন্দন মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত, লাল গোলাপ দিয়ে শুভেচ্ছা জানালেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

শিক্ষাঙ্গন কি আবার রক্তাক্ত হবে?

জি.এম.ফারুক, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক / ৪৬ Time View
Update : বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের চিত্র

একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাঙ্গনে। বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি অর্জনের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিচারক, প্রশাসক, গবেষক ও চিন্তাশীল নাগরিক তৈরির কারখানা। অথচ দুঃখজনকভাবে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আবারও সংঘর্ষ, সহিংসতা ও অস্থিরতার খবর উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে—আমরা কি আবার সেই পুরোনো সহিংস রাজনীতির চক্রে ফিরে যাচ্ছি?

প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে লুকিয়ে থাকে হাজারো পরিবারের ত্যাগের গল্প। একজন কৃষক, একজন দিনমজুর, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা একজন চাকরিজীবী—নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানের উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করেন। তাঁদের স্বপ্ন একটাই—সন্তান মানুষ হবে, সমাজ ও দেশের উন্নয়নে অবদান রাখবে, বার্ধক্যে বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাবে।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে যদি সেই সন্তানের হাতে বইয়ের বদলে লাঠি, ধারালো অস্ত্র কিংবা সহিংসতার প্রতীক দেখা যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—আমরা শিক্ষিত নাগরিক তৈরি করছি, নাকি সংঘাতের নতুন প্রজন্ম?

বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্রসমাজের গৌরবোজ্জ্বল অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে ছাত্রসমাজ জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে বর্তমানের কিছু সহিংস ঘটনার কোনো মিল নেই। আদর্শের রাজনীতি আর আধিপত্যের রাজনীতি এক নয়। মতভেদ আর সহিংসতা এক নয়। নেতৃত্ব আর সন্ত্রাস কখনো একই অভিধানে স্থান পেতে পারে না।

বিগত কয়েক দশকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সংঘটিত বহু সহিংস ঘটনায় অসংখ্য শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছেন, অনেকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়েছেন, আবার অনেকের শিক্ষাজীবন ধ্বংস হয়েছে। প্রতিটি মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো জাতির ক্ষতি। একটি মেধাবী প্রাণ হারানো মানে দেশের ভবিষ্যতের একটি সম্ভাবনার মৃত্যু।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এবং সাংগঠনিক আধিপত্যের অভিযোগ বারবার সামনে আসে। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ শিক্ষার্থীরা, যারা রাজনীতি নয়—শুধু নিরাপদে পড়াশোনা করে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে চায়। তাদের ক্লাস বন্ধ হয়, পরীক্ষা পিছিয়ে যায়, আবাসিক হল অনিরাপদ হয়ে ওঠে, আর শিক্ষাঙ্গনের স্বাভাবিক পরিবেশ বিনষ্ট হয়।

গণতন্ত্রের জন্য রাজনৈতিক সচেতনতা প্রয়োজন, কিন্তু সহিংসতা কখনো গণতন্ত্রের ভাষা হতে পারে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রয়োজন, কিন্তু প্রতিপক্ষের কণ্ঠরোধ নয়। নেতৃত্ব প্রয়োজন, কিন্তু অস্ত্রের মহড়া নয়। বিশ্ববিদ্যালয় যদি যুক্তির বদলে শক্তির প্রদর্শনের মঞ্চে পরিণত হয়, তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে দেশের গণতন্ত্র, শিক্ষা ও অর্থনীতির।

এখন সময় এসেছে ছাত্ররাজনীতির বর্তমান কাঠামো নিয়ে খোলামেলা জাতীয় সংলাপের। কীভাবে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ বজায় রেখে শিক্ষাঙ্গনকে দলীয় সংঘাতমুক্ত রাখা যায়, সেই পথ খুঁজতে হবে। নিয়মিত, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে শক্তিশালী করার প্রস্তাব বহুদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। সেই সঙ্গে প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং সহিংসতার সঙ্গে জড়িত যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে আইনের সমান প্রয়োগ।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদেরও আত্মসমালোচনার সময় এসেছে। আমরা কি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করছি, যেখানে ভিন্নমতকে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করা শেখানো হয়, নাকি শক্তি প্রয়োগকে স্বাভাবিক করে তোলা হয়?

শিক্ষাঙ্গনে কোনো শিক্ষার্থীর পরিচয় আগে “শিক্ষার্থী”—তারপর অন্য সব পরিচয়। কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, কোনো সংগঠনের ব্যানার কিংবা কোনো মতাদর্শ একজন শিক্ষার্থীর জীবন, নিরাপত্তা ও শিক্ষার অধিকারের ঊর্ধ্বে হতে পারে না।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নতুন করে জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং মানবিক মূল্যবোধের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যে ক্যাম্পাসে বিতর্ক হবে, কিন্তু বিদ্বেষ নয়; নির্বাচন হবে, কিন্তু রক্তপাত নয়; মতের পার্থক্য থাকবে, কিন্তু প্রাণহানি নয়।

দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শ্রেণিকক্ষে, গবেষণাগারে এবং গ্রন্থাগারে—হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কিংবা আদালতের কাঠগড়ায় নয়।

আজ রাষ্ট্র, সমাজ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আমাদের আহ্বান—শিক্ষাঙ্গনকে আর ক্ষমতার প্রতিযোগিতার মাঠ বানাবেন না। ছাত্রদের ব্যবহার নয়, তাদের বিকাশের সুযোগ দিন। কারণ আজকের একজন শিক্ষার্থীই আগামী দিনের বাংলাদেশ। সেই ভবিষ্যৎকে রক্তাক্ত নয়, আলোকিত করাই হোক আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার।

জি. এম. ফারুক হোসেন

ব্যবস্থাপনা সম্পাদক

একুশে সংবাদন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category